জয় সাহা
বুধবার রাতের অন্ধকারে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকে তাণ্ডব, আগুন জ্বালানো এবং আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার ঘটনায় প্রায় ৩৭ ঘণ্টা পরে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। শুক্রবার যাদবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন যাদবপুর কর্তৃপক্ষ। বুধবার রাতভর তাণ্ডব, বৃহস্পতিবার ফের নতুন করে সংঘাত, বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম ভাঙার মতো ঘটনার পরেও কর্তৃপক্ষ যে ভাবে কার্যত নিশ্চুপ ছিলেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্ষোভ দানা বেঁধেছে ছাত্র–শিক্ষকদের মধ্যে। এর উপরে আবার নয়া অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিযুক্ত নিরাপত্তারক্ষীদের একাংশের বিরুদ্ধেই। কারণ, বুধবার রাতের ঘটনার যে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ (যে ফুটেজ ‘এই সময়’–এর কাছেও রয়েছে) পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন কর্তৃপক্ষ, সেখানে দেখা যাচ্ছে— বহিরাগতরা চার নম্বর গেটের বাইরে জমায়েত করার কয়েক মুহূর্ত আগে এক নিরাপত্তারক্ষী গেটের তালার কাছে কিছু একটা করছেন। তারপরেই রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে ওই বহিরাগতরা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে ক্যাম্পাসের ভিতরে। কিন্তু গেটের কাছে থাকা তিন–চার জন নিরাপত্তারক্ষীকে সামান্যতম বাধা দিতে দেখা যাচ্ছে না। ওই ফুটেজে স্পষ্ট— বহিরাগতরা তালা ভেঙে ভিতরে ঢোকেনি। তাদের যেন ঢুকতে দেওয়া হয়েছে!
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া–শিক্ষকদের একটা বড় অংশের প্রশ্ন, আদালতের নির্দেশের পরে যে প্রাক্তন সেনা জওয়ানদের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাঁরাই কি বহিরাগতদের আটকানোর বদলে গেটের তালা খুলে দিলেন? এই ফুটেজ ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিকদের একাংশের নজরেও এসেছে। ফুটেজ থেকে দেখা যাচ্ছে, বুধবার রাতে শুধু মূল চার নম্বর গেট নয়, তার পাশে আরও একটি ছোট গেটও খুলে রাখা ছিল। সেখান দিয়েও বহিরাগতরা কার্যত বিনা বাধায় ভিতরে ঢুকে তাণ্ডব চালাতে চালাতে অরবিন্দ ভবনের দিকে চলে যায়।
ফুটেজ অনুযায়ী, ১২টা ৪০ নাগাদ বহিরাগতদের ভিড়ের পিছু পিছু ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত ভিসি এবং গেরুয়া শিবিরের শিক্ষক সংগঠনের নেতা বুদ্ধদেব সাউ। বেশ কিছুক্ষণ তাঁকে চার নম্বর গেটের সামনে কয়েকজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়। এই সময়েও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কোনও রক্ষীদের বডি ল্যাঙ্গোয়েজে কোনও উত্তেজনার ছাপ মাত্র চোখে পড়ছে না ফুটেজে। সিসিটিভি ফুটেজে বুদ্ধদেবকে খানিকক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বেশ কিছুক্ষণ তাণ্ডব চলার পরে বহিরাগতদের একটা অংশ যখন সেখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, তার কিছুক্ষণের মধ্যে বুদ্ধদেবকেও ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরোতে দেখা যায়।
প্রাক্তন আচার্য–রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস নিযুক্ত এই প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত ভিসি অত রাতে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ভিড়ে কী করছিলেন? তিনি এই ফুটেজকে অস্বীকার করেননি। তবে তাঁর যুক্তি, ‘আমি ১১টা নাগাদ আমার সংগঠন থেকে খবর পেয়ে থানার সামনে যাই। সেখানে তখন স্থানীয় বিধায়ক (শর্বরী মুখোপাধ্যায়) ছিলেন। ছাত্ররা (এবিভিপি) সেখানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল। তারপরে আমি ক্যাম্পাসেও যাই। আমাকে সংগঠন থেকে বলা হয়েছিল, ওখানে ছাত্ররা মার খেয়েছে, সেটা দেখার জন্য। তাই আমি ওখানে ছিলাম।’ তাঁর সংযোজন, ‘ছাত্রদের একাংশকে খেপাতে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে ন্যারেটিভ ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। যদি ওখানে সিপিএমের কোনও অধ্যাপক থাকতেন, তা হলেও কি একই কথা বলা হতো?’ যদিও বাম–পড়ুয়ারা অভিযোগ করছেন, বুদ্ধদেব এই বহিরাগতদের বাধাদান তো দূরের কথা, বরং তাদের তাণ্ডব চালাতে উৎসাহ জোগান। শিক্ষক সংগঠন জুটার সভাপতি পার্থপ্রতিম রায়ও বুদ্ধদেবকে বিঁধে বলেন, ‘এ কথা যদি সত্যি হয় যে, উনি ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে গোটা ব্যাপারটা করেছেন, তা হলে তাঁকে অবশ্যই তদন্তের আওতায় আনা দরকার। দেখতে হবে, শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারেন।’
এ দিন যাদবপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয়ের বহিরাগত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। বুধবারের ঘটনার সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম ভাঙার ঘটনাতেও অভিযোগ জানিয়েছেন তিনি। উপাচার্য এ দিন বলেন, ‘বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে এ ভাবে আসাটা কখনওই কাম্য নয়। তা সে যে দল আর রঙেরই হোক না কেন!’ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটিও তৈরি করেছেন। সেখানে চেয়ারম্যান করা হয়েছে নেতাজি সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ভিসি শুভশঙ্কর সরকারকে। পুলিশ সূত্রে খবর, উপাচার্যের অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার রাতের ঘটনায় বেআইনি জমায়েত, দাঙ্গা–হাঙ্গামা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সম্পত্তির ক্ষতি, ভয় দেখানো এবং জোর করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশের মতো একাধিক ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। একইসঙ্গে বৃহস্পতিবার যাদবপুর থানা চত্বর এবং এইটবি–তে যথাক্রমে এবিভিপি এবং বামেদের অনুমতিহীন জমায়েতের বিরুদ্ধেও নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ।
এ দিন ভেঙে ফেলা এমব্লেম–কে সারিয়ে পুনঃস্থাপিত করা হয়েছে চার নম্বর গেটে। তখন অবশ্য উপাচার্য–সহ রেজিস্ট্রারকে সেখানে দেখা যায়। বুধ এবং বৃহস্পতিবারের ঘটনার প্রতিবাদে এ দিন অর্ধদিবস কর্মবিরতি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটা বড় অংশ। বিকেলে যাদবপুরের খেলার মাঠ থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করেন প্রতিবাদীরা। সেখানে ছাত্র শিক্ষকদের পাশাপাশি প্রাক্তনীদের অনেকেই যোগ দেন। অবস্থান বিক্ষোভে অংশ নেন প্রাক্তন অধ্যাপকরাও। এ দিন অবশ্য কয়েকটি ক্লাসে পরীক্ষা ছিল। যদিও প্রো–ভিসি অমিতাভ দত্ত সেই পরীক্ষা ক্যান্সেল করে দেন একটি ই–মেল পাঠিয়ে। যা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন গেরুয়াপন্থী শিক্ষক সংগঠন এবিআরএসএমের সদস্য অধ্যাপক ভাস্কর সর্দার।