এই সময়: বুধবার রাতভর কার্যত তাণ্ডব চলেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিরোধীরা জোট বেঁধে বিজেপি এবং আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)–কে কাঠগড়ায় তোলা শুরু করেছে। অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসের গেট ভেঙে এবিভিপির একদল বহিরাগত ভিতরে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছে। বিরোধীদের তৈরি করা গুন্ডামির ‘ন্যারেটিভ’ ভেস্তে দিতে শুক্রবার সকাল থেকে জোট বেঁধেছে গেরুয়া ব্রিগেডও। শমীক ভট্টাচার্য থেকে দিলীপ ঘোষ সকলেই হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়েছেন যাদবপুর–এবিভিপির পাশে। এরমধ্যে অবশ্য ভিন্ন সুর শোনা গিয়েছে শুধু রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর ভিডিয়ো বার্তায়। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্যুতে রাজনীতিকদের অনুপ্রবেশ না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।’
বুধবার রাতে যাদবপুরের ঘটনা নিয়ে হইচই শুরু হতেই কৌশলে ছাত্র সংগঠন এবিভিপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন, ‘কোনও রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠনের পতাকা পোড়ানো বিজেপির সংস্কৃতি নয়। এবিভিপি বিজেপির কোনও ছাত্র সংগঠন নয়। ক্যাম্পাসের ভিতরে কী করবে, সেটা ওদের বিষয়। যা বলার সংগঠন বলবে। ক্যাম্পাসের ভিতরের কোনও বিষয়ে বিজেপি হস্তক্ষেপ করবে না।’ কিন্তু ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই এবিভিপিকে ঢালাও সার্টিফিকেট দিয়েছেন শমীকই। তিনি এ দিন দাবি করেন, ‘এবিভিপির মতো কোনও জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন নন্দলাল বসুর আঁকা ঐতিহ্যশালী এমব্লেমের রেপ্লিকা ভাঙতেই পারে না।’ তাঁর কথায়, ‘এটা পরিকল্পিত চক্রান্ত। এবিভিপি বিজেপির কোনও ছাত্র সংগঠন নয়। তবে জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন। এবিভিপির যা লক্ষ্য, সেই অনুযায়ী নন্দলাল বসুর লোগো ভেঙে ফেলার মতো গর্হিত কাজ ওরা করতেই পারে না।’
তা হলে এমব্লেম ভাঙল কারা?
শমীকের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘সেটা সবাই জানে।’
এদিকে, এবিভিপির পাশে দাঁড়িয়েছেন তমলুকের বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ও। তাঁর দাবি, ‘এবিভিপিকে প্রথম মারা হয়েছে। এমব্লেম কেউ ইচ্ছে করে ভাঙেনি। ওটা গোটা আছে। ভালো আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিলেই হবে। ওটা নন্দলাল বসুই করুন, আর দ্য ভিঞ্চি–ই করুন, কেউ ইচ্ছে করে ওটার উপর দাঁড়ায়নি। প্রথমে এবিভিপি সমর্থকদের মারা হলো কেন? এই অধিকার বামপন্থীদের কে দিয়েছে?’
রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ এ দিন সকালে মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যাদবপুরে দেশবিরোধী কার্যকলাপ চলতে দেওয়া যাবে না। তৃণমূল ওখানে দেশবিরোধীদের পুষে রেখেছিল। আমরা আগে একবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছিলাম। এসএফআইয়ের অফিস ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। আবার যদি যাদবপুরে দেশবিরোধী কার্যকলাপ হয় ফের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হবে।’
যদিও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নন্দলাল বসুর আঁকা এমব্লেম ভাঙাকে হালকা ভাবে নিতে চাইছেন না রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সরাসরি কোনও ছাত্র সংগঠনের নাম উল্লেখ না করলেও সামগ্রিক ভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় তিনি যে অত্যন্ত বিরক্ত সেটা শুক্রবার ভিডিয়ো বার্তায় বুঝিয়ে দিয়েছেন স্বপন। তাঁর কথায়, ‘ছাত্র আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গে নতুন কিছু নয়। তবে দুই ছাত্র গোষ্ঠীর মধ্যে মারপিট কখনই কাঙ্খিত ছিল না। সব থেকে খারাপ লেগেছে যাদবপুরের এমব্লেমকে অসম্মান করা হয়েছে। নন্দলাল বসু তৈরি করছিলেন এমব্লেমটি।’
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে বিজেপির বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান নিয়েও চর্চা শুরু হয়েছে দলের অন্দরে। ছাত্রদের ঝমেলায় তিনি কেন নাক গলাতে গেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। বুধবার মাঝরাতে বিধায়ক যে ভাবে যাদবপুর থানার বাইরে দাঁড়িয়ে বাম ছাত্র–নেতাদের হুমকি দিয়েছেন তার প্রয়োজন আদৌ ছিল কি না, সেই প্রশ্নও তুলছে বিজেপির একাংশ। এমনকী, স্বপন দাশগুপ্তও সরাসরি কারও নাম না করে ভিডিয়ো বার্তায় বলেন, ‘আমার মূল্যায়ন হলো, ছাত্রদের সমস্যা ছাত্ররাই মিটিয়ে নিক। বাইরের লোক যত কম নাক গলায় ততই ভালো। দুর্গাপুজোর যেমন আমরা রাজনীতির অনুপ্রবেশ চাই না, তেমনই যে কোনও রঙের রাজনীতিকরাই যাদবপুর ইস্যুতে প্ররোচনা দেওয়া বন্ধ করুন। আমার মনে হয় অনেক প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে। এটা কোনও দলীয় বার্তা নয়, আমার মনের কথা।’
তবে রাজ্য বিজেপির সভাপতি অবশ্য মনে করছেন, বুধবার রাতে শর্বরীর তৎপরতা যথাযথ। শমীক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে যদি কোনও গন্ডগোল হয়, বিজেপি বিধায়ক সেখানে যেতেই পারেন। তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। শুধু যাদবপুর কেন, কোচবিহারেও যেতে পারেন।’