কলকাতা, 21 অগস্ট: ভাঙচুরের পর ফের চার নম্বর গেটে বসল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো। বুধ ও বৃহস্পতিবারের অশান্তির পর চার নম্বর গেটের উপরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার সেই লোগো ফের লাগানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে নিজের হাতে লোগো প্রতিস্থাপনের করেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য ।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই লোগোটি শুধু একটি প্রতীক নয় । এটি গর্বের জায়গা। সেই গর্বের প্রতীকই ফের গর্বের সঙ্গেই লাগানো হল। গোটা ঘটনার কথা পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। লোগো ফের লাগানো হলেও বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনও উত্তেজনা সম্পূর্ণ প্রশমিত হয়নি ক্যাম্পাসে। হিংসার প্রতিবাদে ছাত্রছাত্রীরা এদিন নাগরিক মিছিলের ডাক দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ থেকে গোলপার্কের কিছুটা আগে পর্যন্ত এই মিছিল হয়।
প্রশ্নে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা
ক্যাম্পাসে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, পড়ুয়াদের উপর হামলা এবং বহিরাগতদের প্রবেশের অভিযোগ ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলছেন পড়ুয়াদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, ঘটনার সময় বারবার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও দ্রুত কোনও কার্যকর সাহায্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থানায় অভিযোগ দায়ের এবং তদন্ত কমিটি গঠন করতেও কেন এতটা সময় লাগল, সেই প্রশ্নও উঠছে।
ছাত্রী এসোনা সেন জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এর আগে এমন নৃশংসতার সাক্ষী হয়নি। রাতে ক্যাম্পাসে ঢুকে আগুন লাগানো হয় এবং পড়ুয়াদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা হয়। ঘটনার জেরে পড়ুয়ারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে ।
চার নম্বর গেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ভেঙে দেওয়ার ঘটনাকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন এসোনা। তাঁর দাবি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকটির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং গর্ব জড়িয়ে রয়েছে। সেই প্রতীক ভেঙে দেওয়ার মানে শুধুমাত্র গেটের ক্ষতি করা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় ও ঐতিহ্যের উপর আঘাত হানা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পারেটিভ লিটারেচারের অধ্যাপক অভিনব বসু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর বারবার আঘাত নেমে আসছে। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটে যে এমব্লেম রয়েছে, সেটির নকশা শিল্পী নন্দলাল বসুর করা। ফলে সেটি ভাঙচুর করা শুধুমাত্র একটি প্রতীক নষ্ট করা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের উপর আঘাত। যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আগুন লাগালেন ভাঙচুর এবং হামলা করলেন তাঁদের সঙ্গে শিক্ষা ও ছাত্রজীবনের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁর দাবি, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছেন। বুধবার রাতের ঘটনাকেও তিনি সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে দাবি করেন।
অভিনব বসুর বক্তব্যে উঠে আসে ‘বিভাজনের রাজনীতি’র প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হিন্দু-মুসলিম, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, ছাত্র-ছাত্রী কিংবা সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার রাজনীতির বিরোধিতা করে এসেছে যাদবপুর। সেই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়কে বারবার আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। তবে শুধু রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও সরব অভিনব ।
তাঁর প্রশ্ন, ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করতে এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে এত সময় লাগল কেন ? ঘটনার প্রায় 37 ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে। এই দেরির কারণ স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। উপাচার্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, ঘটনার সময় উপাচার্য ক্যাম্পাসে থাকলেও পড়ুয়াদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেননি। এমনকী, ঘটনার পরেও কেন দ্রুত পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের আশ্বস্ত করা হল না, সেই প্রশ্নও তোলেন অভিনব। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে উপাচার্যের দায়িত্ব ছিল সঙ্কটের সময় পড়ুয়াদের পাশে থাকা।
ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী রেশমিতারা খাতুনও বুধবার রাতের ঘটনায় বহিরাগতদের প্রবেশের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, ক্যাম্পাসে ঢুকে একদল বহিরাগত সাধারণ পড়ুয়াদের উপর হামলা চালায়। বিভিন্ন সংগঠনের পতাকা পুড়িয়ে দেয়। অরবিন্দ ভবনের সামনে আগুন জ্বালানোর পাশাপাশি দেওয়ালে আঁকা বিভিন্ন ছবি, স্লোগান এবং ছাত্রছাত্রীদের মতপ্রকাশের সঙ্গে যুক্ত লেখা ও দাবিদাওয়াও নষ্ট করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রেশমির প্রশ্ন, এত বড় ঘটনা এতক্ষণ ধরে কীভাবে ক্যাম্পাসের ভিতরে চলল ?
তাঁর অভিযোগ, ঘটনার সময় পড়ুয়ারা বারবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। ফোন করে সাহায্য চাওয়া হলেও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কার্যকর কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে দাবি তাঁর। ঘটনার পরও উপাচার্য পড়ুয়াদের সঙ্গে কোনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেননি। অথচ পড়ুয়াদের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরই। এই পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে বলে দাবি করেন তিনি।
রেশমির বক্তব্য, পড়ুয়ারা পরদিন মিছিল করে তাঁদের দাবি নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ডেপুটেশন দিতে গিয়েছিলেন। তাঁদের মূল দাবি ছিল ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক । ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাঁর প্রশ্ন, একজন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক । এমন পরিস্থিতিতে পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব তাঁরই।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তায় মোতায়েন আধাসামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রেশমি। তাঁর দাবি, অশান্তির সময় পড়ুয়ারা নিরাপত্তা চাইলেও কার্যকর সাহায্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।