সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
শিক্ষকরা যাতে নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পৌঁছতে পারেন সে জন্য রেলকে অনুরোধ করে ট্রেন ছাড়ার সময় ২৫ মিনিট এগিয়ে আনা হয়েছিল। সেই ৩৮৮১২ মেদিনীপুর-হাওড়া লোকাল ৯টা ২৫ মিনিটের পরিবর্তে মেদিনীপুর স্টেশন থেকে সকাল ৯ টায় ছাড়ে। নিয়ম অনুযায়ী, পাঁশকুড়া পৌঁছতে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট থেকে বড়জোর ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিট লাগার কথা। কিন্তু সেই ট্রেনটি নিয়মিত প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে চলছে! ফলে, আবার দাবি উঠেছে, ট্রেন ছাড়ার সময় এগিয়ে আনার। তাতে শিক্ষক থেকে পড়ুয়া, সরকারি কর্মী থেকে নানা কাজে যাওয়া মানুষকে হয়তো আরও আগে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে, কিন্তু সঠিক সময়ে তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন।
অভিযোগ, দেরিতে পৌঁছনোর দৌড়ে শুধু এই একটি ট্রেনই নয়, বছরের পর বছর ধরে খড়্গপুর ডিভিশনে চলা প্রায় সব ইএমইউ, মেমু লোকালের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে চলেছে। যাত্রীদের দাবি, বছর তিনেক থেকে এই ঝক্কি আরও বেড়েছে। সময়ানুবর্তিতার নিরিখে একেবারে পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে দক্ষিণ–পূর্ব রেলের খড়্গপুর শাখা। দেশের ৭০টি রেলওয়ে ডিভিশনের মধ্যে কোন ডিভিশন কতটা সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখতে পারছে তা নিয়ে ভারতীয় রেলের পক্ষ থেকেই সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেই দেখা যাচ্ছে, খড়গপুর ডিভিশনের সময়ানুবর্তিতা একেবারে তলানিতে। ৭০টি ডিভিশনের তালিকায় এই ডিভিশন রয়েছে ৬৯ নম্বর স্থানে! অর্থাৎ, শেষের দিক থেকে দ্বিতীয়!
কিন্তু কেন এমন পরিস্থিতি? রেলের দাবি, উন্নয়নমূলক কাজ চলার কারণে মাঝে মধ্যে কিছু ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে। কিছু ট্রেনকে ঘুরপথে চালাতে হচ্ছে। যাত্রী সুরক্ষা মেনে কাজগুলো করতে গিয়ে কিছু ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে চালানো যাচ্ছে না। খড়্গপুর ডিভিশনের সিনিয়র ডিভিশনাল কমার্শিয়াল ম্যানেজার নিশান্ত কুমার বলছেন, ‘আগামী দিনে উন্নত পরিষেবার জন্যই এখন কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। সর্বত্রই রেলের উন্নয়নের কাজ চলছে। তাই ট্রেন বাতিল পর্যন্ত করতে হচ্ছে। ভালো পরিষেবা পেতে হলে শুরুতে একটু সমস্যা তো হবেই।’
রেলযাত্রীরা জানাচ্ছেন, খড়্গপুর ডিভিশনের খড়্গপুর-হাওড়া শাখাতেই এক সময়ে ১৬৬টি ইএমইউ এবং ৬টি মেমু চলত। করোনার পর থেকে সেই যে ২২টি ইএমইউ ও ৬টি মেমু বন্ধ হয়েছিল তা আর চালু হয়নি। কেবলমাত্র শিরোমণি এক্সপ্রেস ছাড়া আর কোনও ট্রেনই নিয়মে চলে না। এখন এক-দেড় ঘণ্টা ট্রেন লেট তো অতি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওড়া-ঘাটশিলা মেমু চার ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে চলছে। ঘাটশিলাতে যে ট্রেনটি দুপুর ২টো ৩৫ মিনিটে ছেড়ে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে পাঁশকুড়ায় পৌঁছনোর কথা সেটি রাত ৮টা থেকে ৯টায় পাঁশকুড়ায় ঢুকছে!
যাত্রীদের দাবি, সম্প্রতি সাঁতরাগাছি-ঝাড়গ্রাম এবং ভদ্রক এক্সপ্রেসও দেরিতে চলেছে। জলেশ্বর-হাওড়া প্রায় প্রতিদিনই এক ঘণ্টা দেরিতে চলে। মেদিনীপুর-হাওড়া লোকাল ট্রেনগুলো কখন ছাড়বে আর কখন পৌঁছবে তা বোঝা কঠিন। দু’–তিন ঘণ্টা দেরি করে চলাটা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ট্রেন ছেড়ে বাসে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মেদিনীপুরের বাসিন্দা অরুণ পাল বলছেন, ‘যে হাওড়া-মেদিনীপুর লোকাল মেদিনীপুরে সন্ধে সাড়ে ৭টায় পৌঁছনোর কথা, সেটি রাত ১০টায় ঢুকছে। এখন ট্রেনে যাতায়াত মানে সারাদিনে আর অন্য কোনও কাজ রাখা যাবে না।’ হাওড়া-জকপুর প্যাসেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য লাল্টু মাইতির কথায়, ‘শিরোমণি বাদে একটি ট্রেনও সময়ে চলছে না। ভীষণ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আমাদের মতো নিত্যযাত্রীদের। তাই দু’টি শিরোমণি এক্সপ্রেসেই যাতে ১৬টি করে বগি দেওয়া যায় সেই আবেদন জানিয়েছি। ওই ট্রেনে বড্ড ভিড় হচ্ছে। বর্তমানে একটিতে ১২টি বগি ও অন্যটিতে ১৪টি বগি রয়েছে।’
রেলের দাবি, উন্নয়নের কাজ চলায় কিছু করার নেই। অল ইন্ডিয়া লোকো রানিং স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের খড়্গপুর ডিভিশনের ডিভিশনাল সেক্রেটারি বিষ্ণুপদ পাত্রও বলছেন, ‘হাওড়া স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম না–মেলায় বেশি সমস্যা হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনকে আটকে রাখতে হয়। সেই কারণেই দেরি হচ্ছে। আর একটি ট্রেন দেরিতে ঢোকার অর্থ সেটা দেরিতেই ছাড়বে। তার উপরে নানা কারণে মাঝপথে আটকে থাকার ঘটনাও ঘটছে।’