সৌমেন রায় চৌধুরী ও অভিরূপ দত্ত
চিনির দাম আকাশছোঁয়া। গত এক সপ্তাহ ধরে টানা বাড়ছে চিনির দাম। আমজনতার পকেটে চাপ পড়ছে, রান্নাঘরে টান পড়ছে চিনিতে। অন্যদিকে মাথায় হাত মিষ্টি ব্যবসায়ীদের। চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় পুজোর মরশুমের আগে মিষ্টি তৈরির খরচও বাড়বে বলেই আশঙ্কা তাঁদের। সেটা হলে ধাক্কা লাগবে ব্যবসায়। একই আশঙ্কা বেকারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদেরও। কিন্তু কেন বাড়ছে চিনির দাম? এই সময় অনলাইন খোঁজ নিল তারই। বিক্রেতা থেকে ব্যবসায়ী, সবারই আশঙ্কা E20 পেট্রলের জন্য ইথানল তৈরি হচ্ছে—ইথানল এবং চিনি, এই দুই-ই আখ থেকে তৈরি হয়। সেই কারণেই চিনির দাম বেড়ে গিয়েছে বলে মনে হচ্ছে একটা বড় অংশের।
কী বলছেন বিক্রেতারা?
উত্তর ২৪ পরগনায় মুদিখানার জিনিসের ব্যবসা করেন অখিল কুণ্ডু। তিনি জানান, জোগান কম এবং চাহিদা বেশি, তার জন্যই দাম বেড়েছে। দাম বেড়েছে বলে চাহিদা কমেছে বাজারে। অনেকেই কম করে নিচ্ছে বলে জানাচ্ছেন আর এক বিক্রেতা শিবশঙ্কর সাহা। ওই জেলারই মুদি ব্যবসায়ী ভবতোষ সাহা বলছেন, ‘১০ দিনের মধ্যে প্রতি কিলোতে ১০ টাকা চিনির দাম বেড়েছে। পুজোর জন্য চিনির চাহিদা বাড়ে। এখন যদি এ ভাবে দাম বাড়তে থাকে, তাহলে এর পরে তো আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।’ ইথানল নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বিক্রেতা শুভেন্দু সাহার মনেও। তিনি বলছেন, ‘প্রতিদিন বাড়ছে চিনির দাম। কারণ রাজ্যে জোগান নেই। সরকার নিয়ন্ত্রণ না করলে জোগান নিয়ে সমস্যা হবে। গত দেড় মাসে পাইকারিতেই কেজিতে ১৫-১৬ টাকা বেড়ে গিয়েছে।’ তিনি জানাচ্ছেন, বাইরে থেকে চিনি এলেও কাজ হবে না। আমদানি হওয়ার চিনি দিয়ে মিষ্টির কাজ হয় না ঠিকমতো।
বেকারি ব্যবসায় প্রভাব:
চিনির দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে ছোট ছোট বেকারি কারখানায়। ওয়েস্ট বেঙ্গল বেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানাচ্ছেন, চিনির দাম এত বেড়ে যাওয়ায় বেকারি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। তিনি বলছেন, ‘সামনে পুজো এবং তারপরে ইংরেজি নববর্ষের সময়ে কেক-প্য়াস্ট্রি-কুকিজ়ের চাহিদা বাড়ে।’ সেই সময়ে চিনির দাম আকাশছোঁয়া হলে উৎপাদনে বড়সড় ধাক্কা লাগবে বলেই আশঙ্কা তাঁর। আরিফুলের দাবি, ‘দেশে চিনি পর্যাপ্ত ছিল।’ তাঁর আরও সন্দেহ, E20 পেট্রলের জন্য ইথানল তৈরির ক্ষেত্রে যেহেতু আখ লাগে, তাই চিনির ক্ষেত্রে জোগান মিলছে না।
এই সময় অনলাইনকে মিষ্টি ব্যবসায়ীদের চিন্তার কথা জানালেন কেসি দাসের কর্ণধার ধীমান দাস। তিনি বলছেন, ‘দাম বাড়ছে, এমনটাই শুধু নয়। চিনি তো পাওয়াও যাচ্ছে না।’ তিনি জানাচ্ছেন, রাখি-জন্মাষ্টমী-গণেশ পুজোর হাত ধরে উৎসবের মরশুম শুরু হয়ে গিয়েছে। এর পরে দুর্গাপুজো রয়েছে। পুজোর পরেই বিয়ের মরশুম। চিনির দামে লাগাম আনার জন্য মুখ্যমন্ত্রী এবং পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের দ্বারস্থ মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। কেন্দ্রের কাছে দরবার করেছেন তাঁরা। ধীমান দাসের বক্তব্য, ‘এত বছর ধরে তো এই জিনিস হয়নি। ৪৩-৪৫ টাকার মধ্যে চিনির দাম ঘুরছিল। হঠাৎ এক মাসের এমন কী হলো?’ তাঁরও সন্দেহ, ইথানল তৈরির জন্য আখ-চিনি লাগছে, তার জন্য জোগান কমতে পারে।
ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (BPCL)-এর প্রাক্তন সিনিয়র এগজ়িকিউটিভ তথা এনার্জি পলিসি ও বিকল্প জ্বালানি গবেষক সমীরণ মজুমদার জানাচ্ছেন, E20-এর জন্য ইথানল প্রয়োজন ঠিক। কিন্তু শুধু সেটার জন্যই চিনির দাম বাড়ছে, এমনটা মনে করছেন না তিনি। তাঁর মতে আরও নানা ফ্যাক্টর জড়িত থাকতে পারে, যেগুলির সঙ্গে সরাসরি ইথানলের সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। কেন এ কথা বলছেন তিনি?
সমীরণ মজুমদারের যুক্তি, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি কত ইথানল নেবে, তা এক বছরের চুক্তি করে নেয় আগে থেকেই। শেষ চুক্তি অনুযায়ী বলা হয়েছে, যত ইথানল নেওয়া হবে, তার মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ ভুট্টাজাতীয় শস্য থেকে প্রাপ্ত হতে হবে।’ ফলে পুরো প্রক্রিয়াটাই যে আখ থেকে ইথানল তৈরি হচ্ছে, এমনটা নয়। এ ছাড়া তিনি আরও জানালেন, আগে আখের রস থেকে ইথানল তৈরি হতো। এখন আখের ছিবড়ে, চালের খুদ থেকেও ইথানল তৈরির প্রক্রিয়া রয়েছে।
রয়েছে অন্য যুক্তিও। দেশে চিনির দামের রেকর্ড বৃদ্ধির পিছনে সরাসরি কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে ইথালন উৎপাদনকে। আখের যা মজুত রয়েছে, তা থেকে একটি অংশ ইথানল তৈরির জন্য সরিয়ে ফেলা হচ্ছে বলেই চিনির উৎপাদনে টান পড়েছে বলে অভিযোগ। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি উৎপাদক। তার পরেও কেন দেশের অন্দরে চিনিতে টান পড়ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিবিধ রিপোর্ট, স্ট্যাটিসটিক্স ঘেঁটে যে সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট যে, ভারতে যা চিনি উৎপাদিত হয়, তা দেশের জন্য পর্যাপ্ত। ইথানল তৈরির জন্য আখ সরিয়ে রাখার পরেও যা উৎপাদন হবে, স্বাভাবিক সময়ের জন্য সেটা কাজ চলে যাওয়ার মতো। কিন্তু উৎসবের মরশুমে চিনির চাহিদা হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে যায়। সেই অতিরিক্ত চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না জোগান। সেই কারণেই দাম বাড়ছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
কারণ যাই হোক, আমজনতার পকেটে টান কমাতে সরকার কোনও পদক্ষেপ করে কি না, এখন সে দিকে তাকিয়ে সকলে।