এই সময়: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার রাতের তাণ্ডব এবং বৃহস্পতিবার সকালের গোলমাল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চাপানউতোর তুঙ্গে। এই আবহে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে শনিবার মুখ খুললেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এই গোলমালের পিছনে সরাসরি বামপন্থীদের নিশানা করে যাদবপুর ক্যাম্পাসের ভিতর এবং বাইরে ‘জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা’র আহ্বান জানিয়েছেন। যা বিরোধীদের নিশানায় থাকা আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদকে (এবিভিপি) শক্তি জোগাবে বলে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা। শুক্রবার প্রকারান্তরে এবিভিপির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। তিনি দাবি করছিলেন, এবিভিপির মতো একটি জাতীয়তাবাদী সংগঠন যাদবপুরে তাণ্ডব চালাতেই পারে না। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ এবং রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে সওয়াল শোনা গিয়েছে স্বপন দাশগুপ্ত, অগ্নিমিত্রা পালের গলায়।
বুধবার রাতভর ক্যাম্পাসে তাণ্ডবের নেপথ্যে সরাসরি এবিভিপির বিরুদ্ধেই আঙুল তুলেছে বামেরা। তাদের সুরেই রাজ্যের শাসকদলকে বিঁধেছে তৃণমূলও। সেই আবহে শনিবার বিকেলে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের একটি অনুষ্ঠান থেকে শুভেন্দু বলেন, ‘অনেকে যাদবপুর নিয়ে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছেন! তাঁরা জানেন কি, যাদবপুরে বন্দে মাতরম ধ্বনি তুলতে দেওয়া হয় না? যাদবপুরে জাতীয় পতাকা ওঠে না, শিক্ষা দপ্তরকে পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হয় না! সিসিটিভি লাগাতে দেওয়া হয় না।’ এর জন্য ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’কেই দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর কথায়, ‘যাদবপুরে এক শ্রেণির টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং আর এক শ্রেণির জেহাদি আছে। যারা রাষ্ট্রবিরোধী। তারা ১৫ অগস্ট, ২৬ জানুয়ারি পালন করে না।’ তাদের কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘আমরা যাদবপুরের ভিতরে ও বাইরে জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠা করবই। এই সরকার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্ন নিয়ে এসেছে। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হবে। রাষ্ট্রবাদ, ভারতীয় সংস্কৃতি ও সনাতন সংস্কৃতির সঙ্গে কোনও সমঝোতা আমরা করব না।’ যাদবপুর ইস্যুতে যাঁরা বামপন্থীদের পক্ষ নিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশে শুভেন্দুর সাফ বার্তা, ‘এই রাজ্যে থাকতে গেলে বন্দে মাতরম গাইতে হবে। দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কোনও আপস এই মুখ্যমন্ত্রী করবেন না— এটা সবাই লিখে রাখুন।’
এরপরেই বামেদের নিশানা করে ভবানীপুরের ওই সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ‘জামানত জব্দ হওয়া পার্টির লালবাবুরা হঠাৎ দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে যাদবপুরের ভিতরে ঢুকে মড়াকান্না কাঁদছেন।’ এর থেকে সিপিএমের কোনও রাজনৈতিক ফায়দা হবে না বলেও জানান তিনি। কেন হবে না, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এ দিন তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে এই জায়গায় এসেছি। সিপিএমের সূর্য যখন মধ্যগগণে, তখন আমি সিপিএমের ছোট মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়েছি। পরবর্তীতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দু’বার হারিয়েছি।’
শুভেন্দু এ দিন বিকেলে যাদবপুরের ভিতরে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার ডাক দিলেও তাঁর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল শনিবার সকালে কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাজনীতির প্রবেশের বিরুদ্ধেই সওয়াল করেছেন। ঠিক যে কথা শুক্রবার শোনা গিয়েছিল রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর ভিডিয়ো বার্তাতেও। রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা এ দিন যাদবপুর প্রসঙ্গে বলেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এনব্লেম ভেঙে ফেলা হচ্ছে, বাইরের ছেলেরা ঢুকছে— যে দলই এই কাজ করুক, আমার দলের লোক হলেও আমরা সমর্থন করি না।’ তাঁর আহ্বান, ‘কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে রাজনীতি আনবেন না। রাজনীতি ক্যাম্পাসের বাইরে করুন। কিছু বিষয় রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত।’ কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটলে কী হয়, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অগ্নিমিত্রার সংযোজন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি করতে গিয়েই এক সময়ে অনিলায়ন, পার্থায়ন, মমতায়ন হয়েছিল। এখন আর এ সব হবে না।’
অগ্নিমিত্রার মন্তব্যের সঙ্গে মিল রয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কথার। সুকান্ত নিজেও এক সময়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি এ দিন সংবাদমাধ্যমে যাদবপুরের ঘটনার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বলেন, ‘দু’দল ছাত্রের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। আমি বলব, বড়দের এর মধ্যে না ঢোকাই ভালো। ছাত্ররা এ রকম অনেক কিছু করে। নতুন কিছু নয়। আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম প্রথম হচ্ছে, তা তো নয়।’ তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘দেশের বহু নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ভাবে বামপন্থীদের উৎখাত করেছে এবিভিপি। যাদবপুরেও গণতান্ত্রিক ভাবে সম্ভব।’
তবে যাদবপুর ইস্যুতে শুভেন্দুর মতোই কড়া পদক্ষেপের পক্ষপাতী রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। শুক্রবার তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের কথা বলেছিলেন। এ দিন সুর আরও চড়িয়ে তিনি বলেন, ‘যাদবপুর একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। ওখানে ভারতের সংবিধান চলবে না, এটা তো হতে পারে না। যাদবপুরে দেশবিরোধী গতিবিধি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা বেশি দিন চলতে পারে না।’
বুধবার রাতে যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের যাওয়া নিয়েও তোপ দেগেছেন বিরোধীরা। যদিও শর্বরী এখনও নিজের অবস্থানে অনড়। এ দিন তিনি বলেন, ‘যত বার রাষ্ট্রবাদকে আক্রমণ করা হবে, ভারতীয় সংস্কৃতির অবমাননা হবে, তত বার আমি গর্জে উঠব। সুর নরমের কোনও প্রশ্ন নেই। যাদবপুরের দেওয়ালে যে সব দেশবিরোধী স্লোগান আছে, সেগুলো মুছে দিয়ে আমরা ঋষি অরবিন্দর বাণী লিখব।’
যদিও বিজেপিকে পাল্টা বিঁধে সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্যের কটাক্ষ, ‘বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার ইতিহাসকে যত অপমান করবে বিজেপি, তত তাড়াতাড়ি মানুষের মন থেকে মুছে যাবে। সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে।’ কালীঘাট তৃণমূলের তরফে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষের প্রতিক্রিয়া, ‘দু’দিন পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও এক জনও গ্রেপ্তার হয়নি। সরকার কি অপরাধীদের আড়াল করছে?’ যাদবপুরের ঘটনায় নিন্দার সুর বিদ্রোহী তৃণমূলের বিধায়ক সন্দীপন সাহার গলাতেও। তিনি বলেন, ‘যাদবপুরে যা হচ্ছে, তা কখনও কাম্য নয়। আমিও সেন্ট জ়েভিয়ার্স কলেজে পড়তাম। কিন্তু আমরা ছাত্রাবস্থায় এ রকম কখনও দেখিনি।’