এই সময়: অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকল্পের টাকা এখনও ঢোকেনি— এই অভিযোগ তুলে গত কয়েক দিন ধরেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বহু মহিলা। শুক্রবার রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল পশ্চিম মেদিনীপুরে জেলাশাসকের অফিসে বৈঠকে যোগ দিতে গেলে সেখানে বিক্ষোভকারীদের প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনিও। কোথাও বিক্ষোভকারীরা রেল অবরোধ করেছেন, কোথাও সরকারি অফিস ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য মনে করছেন, পিছন থেকে আন্দোলনকারীদের মদত দিচ্ছে বিরোধী দল তৃণমূলেরই বিভিন্ন গোষ্ঠী। তাদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ‘আমাকে ধমকে–চমকে লাভ নেই।’ শনিবার দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে একটি সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে শুভেন্দু বলেন, ‘২০–৩০ জন লোক জড়ো করে মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে লেকচার দিয়ে সুবিধে হবে না। শুভেন্দু অধিকারী মাথা নত করার লোক নয়।’
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা কেন আবেদনকারী সব মহিলা পাচ্ছেন না— এই প্রশ্নেই মূলত বিক্ষোভ চলছে বিভিন্ন জেলায়। এই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বিরোধীরাও তৎপরতা বাড়াচ্ছে। বিরোধীদের এই কৌশল যে কোনও কাজে আসবে না— শনিবার সেই বার্তা স্পষ্ট করতে শুভেন্দু উল্লেখ করেন মাত্র তিন মাস আগে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলায় বিজেপির ক্ষমতায় আসার প্রসঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি স্পষ্ট জনমত পেয়েছি। ২ কোটি ৯২ লক্ষ মানুষের ভোট বিজেপির দিকে। ২০৮টি আসন পেয়েছি। ফলতায় এক লাখ ভোটে জিতেছি।’ সেই জনসমর্থন যে এখনও অটুট, সেই দাবি জানিয়ে শুভেন্দুর সংযোজন, ‘সামনেই নন্দীগ্রাম, রেজিনগরে উপনির্বাচন। আবারও প্রমাণ হয়ে যাবে, মানুষ নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আছে।’
তাঁর আরও দাবি, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে শুক্রবারের বিক্ষোভে যত ভিড় হয়েছিল, তার অনেক বেশি ভিড় হয়েছে অন্নপূর্ণা যোজনার ভাতা–প্রাপক মহিলাদের ‘অভিনন্দন যাত্রা’ কর্মসূচিগুলিতে। এরপরেই তৃণমূলের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘কুড়িটা লোককে রাস্তায় নামিয়ে ওই খণ্ড–বিখণ্ড হয়ে যাওয়া তৃণমূল সুবিধে করতে পারবে না। ওদের কোনও বুদ্ধি চলবে না। আমরা ইতিমধ্যেই রাজ্যের ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলাকে অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় এনেছি।’ বিজেপির একাংশ মনে করছে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বিরোধীদের লাগাতার প্রচারে কিছু মানুষের মনে বিজেপি সরকার সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই সন্দেহ দূর করতে মুখ্যমন্ত্রী এ দিন ভবানীপুরের অনুষ্ঠান থেকে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা বিচলিত হবেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৫ বছর এ রাজ্যের সর্বনাশ ছাড়া কিছু করেননি। চাকরি বিক্রি করেছেন। শিল্প তৈরি করেননি। ২০২১–এ মাত্র পাঁচশো টাকা মহিলাদের দিতে (লক্ষ্মীর ভাণ্ডার) কত দিন লাগিয়েছিলেন, মনে আছে তো?’ তাঁর সংযোজন, ‘২০২৪–এর লোকসভা ভোটের আগে সেটা হাজার হয়েছিল। আর বিধানসভা ভোটের (২০২৬–এর) তিন মাস আগে দেড় হাজার হয়েছিল। অথচ ২০১৯–এ (লোকসভা ভোটে বাংলায়) বিজেপি যেখানে জিতেছিল, সেই সব এলাকার মহিলারা ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।’
যদিও কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘বিজেপি সরকার সম্পর্কে যে তিন মাসেই বাংলার মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে, সেটা সবাই বুঝতে পারছেন। তৃণমূল সরকারের সময়ে বিপুল সংখ্যক মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুদান পেয়েছেন। কোথাও কোনও সমস্যা হয়নি।’
এ দিন ভবানীপুরের অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, প্রকৃত দাবিদার এক জন মহিলাও অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বঞ্চিত হবেন না। অনুষ্ঠান শেষে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তকে পাশে রেখে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে আরও ২০–৩০ লক্ষের (আবেদনকারীর) ব্যবস্থা করা যাবে। কথা দিচ্ছি।’ সরকারের যে বেশি বয়স হয়নি, সে কথা স্মরণ করিয়ে এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, ‘আমাদের সরকারের বয়স খুব বেশি দিন হয়নি। মাত্র ১০৬ দিন। এটা এমন কিছু সময় নয়। যাঁরা ভোটে হেরে গিয়েছেন, তাঁরা চান না, আমরা মানুষের জন্য কাজ করি। আপনাদের ভরসা ভঙ্গ হবে না। শুধু ভাতার জন্য নয়, আপনারা বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে যাতে সর্বস্তরে ব্যাপক উন্নতি হয়।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে রাজ্য জুড়ে ‘অন্নপূর্ণা দিবস’ পালন করা হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু ঘোষণা করেন, ‘আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর অন্নপূর্ণা দিবস পালন করব। জেলায় জেলায় অন্নপূর্ণা যোজনার প্রাপকরা জড়ো হবেন। আমি অন্নপূর্ণা প্রাপক এক লক্ষ মহিলাকে নিয়ে কলকাতায় সভা করব। মোদীজির জন্মদিন পালন করব।’