• দিনে তৈরি হয় প্রায় ১.৫ লক্ষ, শক্তিগড়ের সব ল্যাংচা বিক্রি না হলে কী হয় জানেন?
    এই সময় | ২৩ আগস্ট ২০২৬
  • রূপক মজুমদার

    বাংলার মিষ্টির তালিকা তৈরি করলে, প্রথম দশের মধ্যে অবশ্যই জায়গা পায় ল্যাংচা। রসে চোবানো মিষ্টির লড়াইয়ে রসগোল্লা-পান্তুয়াকে কড়া টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তেলে ভাজা-রসে চোবানো এই মিষ্টি। আর ল্যাংচার নাম উঠলেই তার সঙ্গেই আসে শক্তিগড়ের নাম। রসিকজনেরা মনে করেন, শক্তিগড় খুঁজতে গেলে ম্যাপের বিশেষ প্রয়োজন হয় না। কলকাতা-দুর্গাপুরের হাইওয়ে ধরে গাড়ি গেলেই হলো। নাকে গন্ধের ঝাপটা বুঝিয়ে দেবে যে, এসে গিয়েছে শক্তিগড়। চোখ মেললেই দেখা যাবে হাইওয়ে ধরে সার সার দোকান- তাতে হরেক কিসিমের ল্যাংচার সমাহার।

    ল্যাংচার জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে বহু কাহিনির চল রয়েছে। নাম জড়িয়েছে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কন্যারও। এই মিষ্টি খেয়েই নাকি সন্তানসম্ভবা অবস্থায় রুচি ফিরেছিল তাঁর। তারপর থেকেই নাম ছড়িয়ে পড়ে এই মিষ্টির- থিতু হয় শক্তিগড়ে। কিন্তু এই প্রতিবেদন বহু চর্চিত সেই গল্প নিয়ে নয়। বরং আধুনিক কালে ল্যাংচার বিকিকিনি নিয়ে। শক্তিগড়ের ল্যাংচার নাম-মাহাত্ম্য এতটাই যে, ওই এলাকায় এখন বহু দোকান তৈরি হয়েছে। আর প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজারে হাজারে ল্যাংচা। হিসেব রয়েছে? এই সময় অনলাইন সেই হিসেব খোঁজারই চেষ্টা করেছে।

    স্থানীয় মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, এখন ছোট-বড় দোকান মিলিয়ে গড়ে প্রতি দোকানে প্রতি দিন দেড় থেকে দুই হাজার ল্যাংচা তৈরি হয়। এটা শুধুমাত্র শক্তিগরের আমড়া এলাকার হিসেব। শক্তিগড় বাজারেও রয়েছে পুরোনো বহু দোকান। সেখানে এখনও হাতেগোনা কয়েকটি দোকানে গড়ে ৩-৪ হাজার মিষ্টি তৈরি হয় বলে দাবি। একটা সময়ে শক্তিগড় বাজারই ছিলো ল্যাংচার ঠিকানা। পরে জাতীয় সড়ক তৈরির পরে আমড়া এলাকায় ধীরে ধীরে উঠে আসে বহু দোকান।

    শক্তিগড় ল্যাংচা ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক সামিম মণ্ডল বলেন, ‘এখানে আগে দোকান কম ছিলো। জাতীয় সড়ক হওয়ার পরে শক্তিগড় থেকে প্রায় সব দোকানই এখানে চলে এসেছে। এখন সব মিলিয়ে ৬৮টি দোকান রয়েছে। কম-বেশি সবাই প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার পিস ল্যাংচা তৈরি করে।’ তাহলে সংখ্যাটি চমকে দেওয়ার মতো। দেড় হাজার পিস করে দোকান প্রতি ল্যাংচা ধরলে, প্রতিদিন তৈরি হয় ১ লক্ষ ২ হাজারটি ল্যাংচা। আর যদি সংখ্যাটি ২ হাজার করে ধরা হয়, তাহলে প্রতিদিন দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ল্যাংচা। সব বিক্রি হয় কি? জাতীয় সড়কের দুই ধারে থাকা দোকানগুলির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সব মিলিয়ে ১০-১৫ হাজার ল্যাংচা প্রতিদিনই নাকি পড়ে থাকে।

    বাড়ছে দাম, চাপে ব্যবসায়ীরা:

    এর মধ্যে চিনির দাম বেড়েছে। বিপুল দাম বেড়েছে গ্যাসের। তেল, ছানা থেকে শুরু করে বাকি উপকরণের দামও ঊর্ধ্বগামী। সমস্যা হচ্ছে না? দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ ঘোষ বলেন, ‘ছানা প্রতি কেজিতে ৬০ থেকে ৭০ টাকা বেড়েছে। চিনির দাম বেড়েছে ১৫-২০ টাকা। গ্যাসের দাম তো সবার জানা। ব্যবসা চালানোই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এখন আমরাও বাধ্য হচ্ছি দাম বাড়াতে। ২-৫ টাকা পর্যন্ত প্রতি পিসে দাম বাড়ছে বলে জানাচ্ছেন তিনি। তবে তাঁর দোকানে ল্যাংচা প্রায় পড়ে থাকেই না বলে জানালেন তিনি। তাঁর কথায় ,‘দিন-রাত মিলিয়ে ২ হাজার ল্যাংচা তৈরি হয়। আমাদের দোকান সারা রাত খোলা থাকে। ফলে দিনের দিন পুরোটাই বিক্রি হয়ে যায়।’

    সব মিষ্টি বিক্রি হয়?

    ওই এলাকার আরও একটি বড় ল্যাংচার দোকানের মালিক জাভেদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাটি চলতেই থাকে। দোকানের ল্যাংচা শেষ হওয়ার আগে নতুন ল্যাংচা নিয়ে আসা হয়। কোনও বাসি, অবিক্রিত মাল আমরা ক্রেতাদের দিই না। এটাই আমাদের ব্যবসার মূলধন।’ জাভেদের দোকানেই এসেছিলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে। কলকাতার বহু শিল্পীই স্বাদ নিতে এই দোকানে এসেছেন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ঘোষের দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতি। বুদ্ধদেব গুহ থেকে শুরু করে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়-সহ বহু অভিনেতা এসেছেন এখানে।

    যদি বিক্রি না হয় তাহলে উপায়?

    তাও কি সবার সব মিষ্টি বিক্রি হয়ে যায়? নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুখ খুললেন এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমরা গড়ে দেড় হাজার পিস তৈরি করি। ধরুন বিক্রি হলো না। ২ দিন, খুব বেশি হলে ৩ দিন পর্যন্ত রেখে দিই।’ তার পরে? অবিক্রিত ল্যাংচাগুলো রস থেকে তুলে শুকনো গরম কড়াইয়ে ফের নতুন করে ভাজার মতন করে সেঁকা হয়। তিনি বলছেন, ‘এতে উপরের লেয়ার কোটিংটা আরও মোটা হয়। তারপরে তেল দিয়ে হালকা ভেজে সেটা আবার মোটা রসে ছেড়ে দিই। সেই ল্যাংচাগুলো আলাদা করে রাখা থাকে। কম দামে বিক্রি করে দিই।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁর সংযোজন, ‘এটা করতে বাধ্য হই। না হলে এত খরচ পোষানো যাবে না।’

  • Link to this news (এই সময়)