গৌতম ধোনি
ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের অন্য রকমের গন্ধ আছে। শরীরে বল আসে। নিজেকে আলেকজ়ান্ডার মনে হয়। কানা ওঠা স্টিলের থালায় গরম ভাত বেড়ে দেন নদিয়ায় কৃষ্ণগঞ্জের ‘অন্নপূর্ণা’ পাপিয়া কর। হেসে ওঠে বাচ্চা থেকে বুড়ো। উঠোনে ঘাসফুল আর ভাতের গন্ধ মিলেমিশে যায়। মনে হয়, এই তো স্বর্গ।
রাখির সুতোয় কতটা আবেগ থাকে? উত্তর হলো, এক আকাশ। কিন্তু শুধু তো আবেগ নয়, তার সঙ্গে মিশে থাকে আপনজনকে আগলে রাখা, তার মুখে হাসি ফোটানোর ইচ্ছাও। পাপিয়া নিজের হাতে সেই ইচ্ছা বোনেন। তৈরি করেন ‘অন্নপূর্ণা রাখি’।
বাঙালির ঠাকুর ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো অন্নপূর্ণার সেই ছবিটা মনে আছে? কাঁখে কলসি। তা থেকে মুখ বাড়িয়ে আছে ধানের ছড়া। সেই কলসিতে হাতা ডুবিয়ে শিবের থালায় ভাত দিচ্ছেন অন্নপূর্ণা। পাপিয়ার রাখিতে সেই অক্ষয় কলসের আদল। সেখান থেকেই এই নাম। রাখিতে ছোট্ট একটি ঘট, তার মুখে ধান, পাশে মাঙ্গলিক কড়ি। রং, উল আর জরি দিয়ে সাজানো।
অন্নপূর্ণা রাখির দাম ৫০ টাকা। দেদার বিক্রি হচ্ছে। তাঁর হাতের কাজ বেশ জনপ্রিয়। প্রশংসাও হয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না, সেই রাখি যখন কারও কব্জিতে উঠবে, তখনই হাপুসহুপুস করে গরম ভাত খাবে কেউ। হয়তো তিন দিন তার কিছুই জোটেনি।
পাপিয়ার সত্যনগরের বাড়িতে ঢুকলেই আঠা, কাগজ, জরির গন্ধ। মাদুরের উপরে স্তূপাকার। একদিকে বাবু হয়ে বসে পাপিয়া। পরনে বাটিক প্রিন্টের সালোয়ার কামিজ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। গম্ভীর মুখে ঘটে সুতো বাঁধছেন তিনি। চোখ না তুলেই বললেন, ‘ভাইয়ের মঙ্গলকামনাতেই তো রাখি বাঁধা হয়। আর দেবী অন্নপূর্ণার কাছে আমরা অন্নের প্রার্থনা করি। দু’টো ভাবনাকে একসঙ্গে মিলিয়েছি।’
অন্নপূর্ণার অক্ষয় কলসের মতো পাপিয়ার ‘সরাইঘর’। অনেকটা এনজিও-র মতো। তিনি শিল্পী। কিন্তু ভাবের ঘরে বাস করেন না। বিদেশি এক সাহিত্যিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কবির হাত কেন গড়বে না সেতু কিংবা রেলপথ?’ এই আপ্তবাক্যই যেন পাপিয়ার আদর্শ।
রেলস্টেশনের ধারে, রাস্তার পাশে, ফ্লাইওভারের নীচে যাঁরা ঘর বেঁধে থাকেন, নিরন্ন, অসহায় সেই মানুষগুলোর মুখে অন্ন তুলে দেন তিনি। সপ্তাহে একদিন ধর্মতলার ট্রামডিপোর কাছে পথশিশুদের সঙ্গেও কয়েক ঘণ্টা কাটান। সে দিন যেন পিকনিক। রান্না করা খাবার নিয়ে যান পাপিয়া। গাছতলায় বসে চলে খাওয়াদাওয়া। পড়াশোনা হয়, হস্তশিল্প। কখনও জামাপ্যান্ট নাকে ঠেকিয়ে নতুন পোশাকের গন্ধ শোঁকে কচিকাঁচারা।
তিনি বিশাল ধনী নন। হাতে অঢেল টাকা নেই। কিন্তু ইচ্ছা আঠারো আনা। পাপিয়ার স্বামী অমরেশ সব্জি বিক্রেতা। স্থানীয় বাজারে আলু, পটল বিক্রি করেন। একমাত্র ছেলে সদ্য ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়েছেন। সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। তাঁরাই পাপিয়ার আসল শক্তি। অমরেশ পাপিয়ার কাজে হাতও লাগান। গর্বিত মুখে বললেন, ‘সবাই যখন ওর প্রশংসা করে, খুব ভালো লাগে।’ স্ত্রীর গর্বে গর্বিত স্বামী তিনি।
ছেলে হৃষিকেশ ব্যাঙ্কে চাকরি করেন। কর্মসূত্রে থাকেন হালিশহরে। তিনিও গর্বিত সন্তান। হৃষিকেশের কথায়, ‘এখন আর মায়ের কাজে হাত লাগাতে পারি না। তবে সুযোগ পেলে এখনও মা আর ছেলে মিলে বসে যাই।’ স্বামী-সন্তানই পাপিয়ার ‘সরাইঘরে’-র ভিত। অবশ্য বিয়ের আগে থেকেই এই কাজ করছেন তিনি। বাপের বাড়ি রানাঘাটে পাপিয়াকে সবাই এক ডাকে চেনে।
পাপিয়ার হাতে কখনও সুতো, কাগজ, কখনও মাটি। দুর্গাপ্রতিমা গড়েছেন। এ বার কলকাতার একটি ক্লাবের প্রতিমাও তৈরি হচ্ছে তাঁর হাতেই। তাঁর কাছে ‘অন্নপূর্ণা’ কোনও দেবীমূর্তি নয়। ক্ষুধার্ত মানুষ যখন খাওয়াদাওয়ার পরে তৃপ্তির হাসি হাসেন, সেখানেই ইশ্বরকে খুঁজে পান পাপিয়া।
পাপিয়ার ভরসা সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানেই রাখির বিজ্ঞাপন দেন। অর্ডার আসে। বিক্রি হয়। তাঁর হাতের রাখির সুতোয় মিশে থাকে কারও না-খেতে-পাওয়া দুপুর। প্রতিটি ছোট্ট ঘটের ধানে লুকিয়ে থাকে কারও একমুঠো ভাতের আশা। তাঁর হাতে তৈরি রাখি ভাইয়ের হাতে বাঁধতে বাঁধতে দিদি ছড়া কাটে, ‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে/ কারা যেন আজও ভাত রাঁধে/ ভাত বাড়ে, ভাত খায়।/ আর, আমরা সারা রাত জেগে থাকি/ আশ্চর্য ভাতের গন্ধে/ প্রার্থনায়, সারা রাত।’