এক দশকে কেন্দ্রের চাকরিতে দ্বিগুণ শূন্যপদ, বাড়ছে বেকারের সংখ্যা, আরটিআই-তে প্রকাশ্যে তথ্য
প্রতিদিন | ২৩ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের রিপোর্টে দাবি, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। বলা বাহুল্য, দিল্লি বা ঝাড়খণ্ডের জেন জি-দের আন্দোলনের শিকড় এই বেকারত্বই। অথচ সেই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে শূন্য পদের সংখ্যা ৮.২৩ লক্ষ। কর্মজগতের এই ভারসাম্যহীনতা প্রকাশ্যে এসেছে তথ্যের অধিকার আইনে। গত এক দশকে কেন্দ্রীয় সরকারে শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৫ সালের ৪.২১ লক্ষ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৮.২৪ লক্ষে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে মোট অনুমোদিত পদের অনুপাতে শূন্য পদের হার ১১.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশ হয়েছে। শূন্য পদের এই বন্যা রেল, স্বরাষ্ট্র দপ্তর, প্রতিরক্ষা (অসামরিক) দপ্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। আট লক্ষ বিরাট সংখ্যা হলেও এর মধ্যে নেই রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাঙ্ক বা রাষ্ট্রীয় সাহায্যে চলা সংস্থাগুলি (পিএসইউ)।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৩৯,৩২,২১২টি। ২০২৪ সালের ১ মার্চের রিপোর্ট বলছে, কেন্দ্রের কর্মীর সংখ্যা ৩০,৯৯,৫৫৬ জন। অর্থাৎ কিনা মোট শূন্য পদ—৮,২৩,৬৫৬টি। তথ্যের অধিকার আইনে মামলাকারী সমাজকর্মী চন্দ্রশেখর গৌরের বক্তব্য, সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, সরকারি চাকরিতে প্রতি পাঁচটি পদের মধ্যে অন্তত একটি পদ কর্মীশূন্য। চন্দ্রশেখরের বক্তব্য, “এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। সরকারি চাকরি যুবকদের অধিকার। সরকারের উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবং ‘মিশন মোড’-এ (তীব্র তৎপরতার সঙ্গে) এই শূন্যপদগুলি পূরণের প্রক্রিয়া শুরু করা। এর ফলে তরুণরা যেমন কর্মসংস্থান পাবে, তেমনি দাপ্তরিক কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।”
আরটিআই-এ সামনে এসেছে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরেও গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি পড়ে রয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসা সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে অনুমোদিত পদের সংখ্যা যেখানে ৮০৩টি, সেখানে কর্মরত ৫১৬ জন। অর্থাৎ ২৮৭টি পদ বা অনুমোদিত পদের ৩৫.৭৪ শতাংশই শূন্য। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদিত ৪৪১টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৩১৫ জন কর্মী। ১২৬টি পদ বা ২৮.৫৭ শতাংশ পদ খালি। অর্থাৎ, সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে— রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে অনুমোদিত পদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পদ শূন্য।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা দপ্তরেই শূন্যপদ সবচেয়ে বেশি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক বিভাগে অনুমোদিত পদের সংখ্যা যেখানে ৫,৫৬,২৪৮, সেখানে কর্মরত ৩,১৪,০০৫ জন। অর্থাৎ শূন্যপদের সংখ্যা ২,৪২,২৪৩। বলা বাহুল্য, সংখ্যাটা বিপুল। প্রায় ৪৩.৫ শতাংশ। (এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এর সঙ্গে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর কোনও যোগ নেই।)
পৃথিবীর অন্যমত বৃহত্তম রেল পরিষেবা দেয় ভারতীয় রেল। স্বভাবতই এর কর্মী সংখ্যাও বিপুল। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে অন্যতম বৃহত্তম নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানেও বিপুল শূন্যপদ রয়েছে। যেখানে ১৪,৭৯,৭০১টি পদের বিপরীতে কর্মীর সংখ্যা ১২,৩৯,৫৭৬ জন। অর্থাৎ ২,৪০,১২৫টি পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। আরটিআই তথ্য বলছে, কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে মোট শূন্য পদের প্রায় ৩০ শতাংশই রেলওয়েতে।
এই তথ্য উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের ২০২৪ সালেরই রিপোর্টে জানা গিয়েছিল, দেশে কর্মহীনদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই যুবসমাজ। ওই রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল, কর্মহীনদের মধ্যে শিক্ষিত যুবসমাজের সংখ্যা হু-হু করে বেড়েছে। ২০০০ সালে শিক্ষিত যুবকদের ৫৪ শতাংশ ছিলেন কর্মহীন। ২০২২ সাল পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে ৬৬ শতাংশ। গত চার বছরে যা আরও বেড়েছে বৈ কমেনি। এই পরিস্থিতির মধ্যে নিট প্রশ্নফাঁস বা নেট প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার মতো ঘটনা আগুনে ঘৃতাহুতির সমান। বিশ্লেষকদের বক্তব্য, অবিলম্বে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাহলে প্রশাসনিক দক্ষতা যেমন বাড়বে, তেমনই বেকারত্বের গ্লানি থেকে মুক্ত হবে দেশের যুবসমাজ।