শিক্ষায় দলতন্ত্র! কলেজের গভর্নিং বডির মাথায় বিজেপি সাংসদ-বিধায়করাই
বর্তমান | ২৩ আগস্ট ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শিক্ষাক্ষেত্রে দলতন্ত্র কায়েমে তৃণমূলের পথেই হাঁটল বিজেপি সরকার! অথচ মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার ১০ দিনের মধ্যেই শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে শিক্ষাঙ্গন। সেদিনই রাজ্যের বিভিন্ন বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা রাজনৈতিক মনোনয়ন বাতিল করার কথাও জানান তিনি। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যে তাঁর সরকারের অবস্থান বদলে গেল। রাজ্যের কলেজগুলির পরিচালন সমিতির মাথায় বসানো হল গেরুয়া বিধায়ক, সাংসদ এবং কেন্দ্র-রাজ্যের মন্ত্রীদের। শনিবার উচ্চশিক্ষা দপ্তরের তরফে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের ২৪৭টি কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটিরই মাথায় বিজেপি বিধায়ক-সাংসদ-মন্ত্রীরা। বরং এক-একজন একাধিক কলেজের দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূল সরকার যেভাবে জনপ্রতিনিধিদের স্কুল-কলেজের মাথায় বসিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছিল, সেই পথে কেন হাঁটছে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকারও?
উচ্চশিক্ষা দপ্তরের এক শীর্ষ ব্যক্তিত্ব জানিয়েছে, মূলত ‘দাগী’ কলেজগুলিতেই জনপ্রতিনিধিদের বসানো হয়েছে। কলেজগুলিতে নানা অরাজকতা, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে দপ্তরের কাছে। সেই কারণে শাসকদলের জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে সেই পরিস্থিতির উন্নতিসাধন করতে চায় সরকার। তবে যে-কোনো গেরুয়া জনপ্রতিনিধি নন, বেছে বেছে ন্যূনতম স্নাতকদেরই সভাপতি পদে রাখা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে কলেজগুলির মাথায় শিক্ষাবিদ এবং সমাজকর্মীদের আনার পরিকল্পনাও রয়েছে দপ্তরের।
কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী সুকান্ত মুজমদার বালুরঘাট ও গঙ্গারামপুর কলেজের গভর্নিং বডির মাথায় বসানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় জাহাজ রাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরকে পেয়েছেন হাবড়া শ্রীচৈতন্য এবং গোবরডাঙা হিন্দু কলেজের গভর্নিং কমিটির সভাপতির পদ। কলকাতার ১৮টি কলেজের পরিচালন কমিটির সভাপতির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। একই ক্যাম্পাসে পরিচালিত আশুতোষ, যোগমায়া দেবী এবং শ্যামাপ্রসাদ কলেজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তকে। বিদ্যাসাগর কলেজের তিনটি বিভাগেই দায়িত্বে রয়েছেন এক সময়ের ছাত্রনেতা তথা রাজ্যের বর্তমান শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই পাদপ্রদীপের আলোয় আসা বরানগরের বিধায়ক সজল ঘোষ দায়িত্ব পেয়েছেন বঙ্গবাসী মর্নিং, ডে এবং ইভনিং কলেজের। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সিটি কলেজ এবং আনন্দমোহন কলেজের দায়িত্বে রয়েছেন প্রাক্তন অধ্যাপক তথা তথ্য ও প্রযুক্তি দপ্তরের মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী। উপযুক্ত স্নাতক জনপ্রতিনিধির অভাবে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী অশোক দিন্দাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলকাতার শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজের পরিচালন সমিতির। কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারিকে আনা হয়েছে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র, মহারাজা শ্রীশচন্দ্র এবং মহারানি কাশীশ্বরী কলেজে। রাজারহাট-গোপালপুরের বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারিকে বেলেঘাটার গুরুদাস কলেজ এবং বারাকপুরের বিধায়ক কৌস্তভ বাগচিকে সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের পরিচালন সমিতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বয়ং উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ও রয়েছেন তাঁর জেলা বীরভূমের তিনটি কলেজের দায়িত্বে। বোলপুর, সিউড়ি এবং শম্ভুনাথ কলেজের সভাপতি হয়েছেন তিনি। পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে বানোয়ারিলাল ভালোটিয়া কলেজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এসেছেন সল্টলেকের সত্যপ্রিয় রায় কলেজ অব এডুকেশন এবং লেকটাউনের ইস্ট ক্যালকাটা গার্লস কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি পদে। এপ্রসঙ্গে অল ইন্ডিয়া ডিএসও-র পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘কলেজগুলির স্বায়ত্তশাসন কেড়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে সরকার। অচিরেই কলেজগুলি দলীয় অফিসে পরিণত হবে।’