• ক্ষমতাবান চেয়ারের উপরে সাদা তোয়ালের আচ্ছাদন, জানেন সেই প্রথার ইতিহাস?
    এই সময় | ২৫ আগস্ট ২০২৬
  • যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও দুই সহস্রাব্দ আগের কথা। মিশরে বিশেষত ফারাওরা চারপেয়ে আসনে বসে রাজ্যপাট চালাতেন। সেই আসন ছিল মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতীক। প্রাচীন যুগে গ্রিস, রোম ও চিনেও সোনা, হাতির দাঁত বা দামি পাথর দিয়ে খোদাই করা বিভিন্ন আসন ব্যবহার করার নির্দশন মেলে। আরামদায়ক ভাবে মূলত ক্ষমতাসীনের বসার জায়গা তৈরির ক্ষেত্রে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিরই প্রতিফলন হলো এই আসন — ইংরেজিতে চেয়ার, গোদা বাংলায় যাকে আরামকেদারা বলে। শুধু আরাম নয়, সেই কেদারায় জড়ানো থাকে ধবধবে সাদা তোয়ালেও।

    সম্রাটদের আভিজাত্য এবং মর্যাদার প্রতিফলন ছিল যে সিংহাসন, রেনেসাঁ-পরবর্তী যুগে তাই সাধারণের নাগালে এসে কেদারা হয়ে ওঠে। আরাম ও শিল্পের মাধ্যম হয়ে ওঠে চেয়ার। পরে ১৯ শতকের শিল্প বিপ্লব চেয়ারের ইতিহাস পুরোপুরি বদলে দেয়। ধনীদের রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছতে সক্ষম হয় সেই চারপেয়ে আসবাব।

    একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ক্ষেত্রবিশেষে চেয়ারের ধরন, বৈশিষ্ট্য পৃথক। কয়েক দশক আগেও গেরস্থ বাড়িতে পরিচারকরা চেয়ারে বসতে কুন্ঠাবোধ করতেন। কিছু বললেই তাঁরা বলতেন, ‘আমাদের কি আর চেয়ারে বসা মানায়, বাবু?’ বনেদি বাড়িগুলিতে ডিনার টেবিলের শেষ মাথায় বাড়ির বরিষ্ঠ মানুষটির জন্য পৃথক চেয়ার থাকত। সেই আসনটির দৈর্ঘ্য-প্রস্থেও একটা ভারিক্কি ভাব থাকত। মনীষীদের ব্যবহৃত চেয়ার পূজিত হতো সাধারণ মানুষের সৌজন্যে। স্কুলের শিক্ষকদের চেয়ারের ধারেকাছে ঘেঁষত না পড়ুয়ারা।

    ট্র্যাডিশন বদলাচ্ছে, নকশা বদলাচ্ছে। তবে কোনও কোনও সরকারি অফিসের চেয়ারের ক্ষেত্রে একটি প্রথা আজও অনেকাংশে অপরিবর্তিত। রংচটা দেওয়াল, স্তূপীকৃত ফাইল, মন্থর গতিতে চলা সিলিং ফ্যান বদলে অফিসের টেবিলে কম্পিউটার বসেছে। অনেক অফিসে শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র বসেছে। রিভলভিং চেয়ার আনা হয়েছে। তবে সেই চেয়ারের উপরে সাদা মখমল তোয়ালে ঝোলানো চোখে পড়বে সকলেরই। চেয়ারের উপরে তোয়ালে বিছানোর এই প্রথা কবেকার? নেপথ্যে কারণ কী? এই বিষয়ে অবশ্য নানা মুনির নানা মত।

    তখন দেশে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের যুগ। ব্রিটিশরা ভারত শাসন করছে, পাশাপাশি খানা-পিনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, চলা-ফেরা, ওঠা-বসা, জীবনধারণের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিলিতি কায়দা-কানুনে দেশের মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সময়েই বিভিন্ন সরকারি অফিসে উচ্চপদস্থ অফিসারদের চেয়ারে এই সাদা তোয়ালে রাখার কেতা শুরু হয়।

    প্রতিটি বিষয়ই পদমর্যাদার ক্রম — সেই পদস্থের টেবিলের আকার থেকে শুরু করে ঘরের অবস্থান, প্রবেশপথ থেকে দূরত্ব, আসবাবপত্রের গুণমান, ধরন নির্ধারণ করা হতো। সবচেয়ে বড় কর্মকর্তার চেয়ারটিতেই তোয়ালে রাখা হতো। দর্শনার্থীরা পেতেন বসার সাধারণ ব্যবস্থা। কনিষ্ঠ কর্মীদের জন্য থাকত সাধারণ মানের চেয়ার। কোনও গুরুত্বপূর্ণ অতিথি এলে হয়তো হঠাৎ করেই তোয়ালে-ঢাকা আরেকটি চেয়ারের আবির্ভাব ঘটত। সেই কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এই সাদা তোয়ালে।

    শীতল, ফুরফরে আবহাওয়ার বদলে ইংরেজরা ভ্যাপসা গরম, ঘর্মাক্ত পরিবেশে এ দেশে দিনযাপন করা শুরু করেছেন। অফিসের বাবুরাও ধুলো-কাদামাখা রাস্তা পেরিয়ে অফিস ঢুকতেন। ততক্ষণে সেই আধিকারিক ঘেমে-নেয়ে একাকার। ঘাম মুছে পরিষ্কার হওয়ার জন্যই এই তোয়ালে রাখা থাকত সেই বাবুদের চেয়ারে।

    আজকের শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত রেট্রো ডিজ়াইন বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিদেশে চালু হয়ে গেলেও ভারতের সরকারি অফিসগুলিতে তখন দেশি ফ্যান-ই ভরসা। কাজের মাঝে মুখ-ঘাড় মুছে নেওয়ার জন্য ভরসা ছিল সেই দাদা তোয়ালে।

    বিষয়টি কেবল তোয়ালেতেই সীমাবদ্ধ নয়। টেবিলের আকার কিংবা কালির রঙও পদমর্যাদার ক্রম — সব কিছুই ‘হায়ারার্কি’ অনুযায়ী নির্ধারিত হতো। পদমর্যাদা ও ক্ষমতার ইঙ্গিতবাহী ছিল সেই তোয়ালে।

    ব্রিটিশরাজের অবসান হয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়ে ৭৯ বছর পেরিয়ে গিয়ে সেই প্রথা আজও রয়ে গিয়েছে। আমলা-মন্ত্রীদের চেয়ারে আজও শোভিত হয় সেই সাদা তোয়ালে। রং বদলায়, রাজনীতি বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলায়, সরকার বদলায় — তবে দশকের পর দশক ক্ষমতার চেয়ারে স্বাতন্ত্রের প্রতীক হয়ে থেকে যায় সেই সাদা তোয়ালে।

  • Link to this news (এই সময়)