• 'দলমার দামাল'রা ঘরে না ফিরে স্থায়ী ভাবে ঠাঁই নিল দক্ষিণবঙ্গে
    এই সময় | ২৫ আগস্ট ২০২৬
  • সুমন ঘোষ

    এ রাজ্যের জঙ্গলমহলে দীর্ঘ কয়েক দশকের হাতির ইতিহাস রয়েছে। এক সময়ে হাতির আগে 'দলমার হাতি', 'দলমার দামাল'- এর মতো শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হতো। এখন আর তা হয় না। এখন সব হাতি দক্ষিণবঙ্গের হাতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া কিংবা পুরুলিয়ার জঙ্গলে থাকে।

    অথচ এক সময়ে এই হাতি পরিযায়ী ছিল। পাকা ধানের মরশুমে দলমা থেকে ময়ূরঝর্না, বেলপাহাড়ি, কাঁটাপাহাড়ি হয়ে ছড়িয়ে পড়ত লালগড়, শালবনির জঙ্গলে। তখনও তারা নদী পেরোনোর ঝুঁকি নিত না। এক সময়ে কাঁসাই নদী পেরিয়ে শালবনি থেকে কলাইকুন্ডা হয়ে পৌঁছে গেল কেশিয়াড়ি। এ ভাবেই সুবর্ণরেখা, কাঁসাই, শিলাবতী, কেটিয়া, দামোদর পেরিয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি একবার হাওড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল হাতির দল।

    আগে পাকা ধান শেষ হওয়ার পরেই ফিরে যেত দলমায়। ধীরে ধীরে পাকা ধানের পরেও থাকতে শুরু করে। আলু ও আনাজ খেয়ে বেশ উদরপূর্তি হচ্ছে দেখে থাকার সময় বাড়াতে থাকে। নানা কারণে দলছুট হয়ে যে দু'-একটি হাতি জঙ্গলে থেকে যেত তাদের 'রেসিডেন্ট' হাতি বলা হতো। আর এখন দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে যে ১৮০-১৯০টি হাতি রয়েছে তাদের সকলকেই 'রেসিডেন্ট' বলা ছাড়া উপায় নেই।

    গবেষকরা জানাচ্ছেন, দলমা থেকে প্রথম এ রাজ্যে হাতি ঢুকতে শুরু করে ১৯৭৬-এ। পুরুলিয়ায়। তারপরে কেটে যায় পাক্কা ১০ বছর। আর হাতির দেখা মেলেনি। ফের হাতি দেখা গিয়েছিল ১৯৮৬-এ। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দলমা থেকে হাতি এসেছে, আবার ফিরেও গিয়েছে। শুরুতে এক একটি দলে ৮-১০টির মতো হাতি থাকত। পরবর্তীকালে দলে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০-৫০টি। কখনও কখনও তারও বেশি।

    হাতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক প্রভাতকুমার শীট। তিনি জানান, আগে হাতির দল ঝাড়গ্রামের লাকাইসিনির পাহাড়ি পথ ধরে নেমে আসত কাঁকড়াঝোর উপত্যকায়। তারপরে দুলকি, ঘুরপাহাড়ি পথ পার হয়ে নেস্তরিয়া, বাঁশপাহাড়ির ঢালুপথ ধরে তারা পৌঁছে যেত লালজলার ভ্যালিতে। এরপরে ঘুরপাক খেতে খেতে ওরা পৌঁছে যেত ভুলাভেদা, তামাজুড়ির জঙ্গলে। এলাকা বাড়াতে বাড়াতে বেলপাহাড়ি, নারায়ণপুর, শিলদা, কেচন্দা, তারাফেনি, ভৈরববাঁকি ও কাঁসাই পেরিয়ে রাতের অন্ধকারে ঢুকে পড়েছিল গোয়ালতোড়, লালগড়, ভীমপুর, রামগড়, ধেড়ুয়ার জঙ্গলে। আরও এগিয়ে ওরা পৌঁছে যায় চন্দ্রকোণা, গড়বেতা, পিয়ারডোবা, ধাদিকা, গনগনির শালবন পার হয়ে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর, জয়পুর এমনকী সোনামুখীর জঙ্গলেও। ২০০০ থেকে দলমার হাতিরা তাদের ঘাঁটি এলাকা ও বিচরণভূমি গড়ে নেয় নয়াগ্রাম, কেশিয়াড়ি, গোয়ালতোড়, লালগড়, ভীমপুর, কাঁটাপাহাড়ি, শালবনি, গড়বেতা, পিয়ারডোবা, ধাধিকা, বিষ্ণুপুর, জয়পুরের অরণ্যভূমিতে। ১৯৯০-এর পর থেকেই এ রাজ্যে প্রায় পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করে।

    প্রভাত বলছেন, 'দলমায় খননকার্যের ফলে জঙ্গল সাফ হয়ে যাওয়ার কারণেই হাতির দল খাবারের সন্ধানে এ রাজ্যে আসতে শুরু করে। ১৯৯০-এ দলমার যে হাতির বড় দু'টি দল রাঁচির দিক থেকে চান্ডিল পেরিয়ে মরশুমি ভ্রমণে এসেছিল, তারা আর চান্ডিলের ওপারে ফিরে যেতে পারেনি। কারণ, তত দিনে পাহাড় কেটে গভীর সেচ খাল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকেই পাকাপাকি ভাবে এ রাজ্যেই থাকা শুরু করল হাতি।'

    খাবারের খোঁজে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে হানা দিতে শুরু করল লোকালয়ে। হাতির হানায় শুরু হলো শস্যহানি, প্রাণহানি, হাতি-মানুষের সংঘাত। পাল্টা আঘাতে হাতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে চলেছে।

    (চলবে)

  • Link to this news (এই সময়)