মাসখানেক ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দর। Price Monitoring Division-এর তথ্য অনুযায়ী, এখন থেকে গত এক বছরে দাম বেড়েছে প্রায় ৫৯%। তার প্রমাণ দেখা যাচ্ছে দেশের নানা রাজ্যে, বাদ নেই পশ্চিমবঙ্গ। একদিকে চিনি, অন্যদিকে পেঁয়াজের দামের জেরে বাড়ির হেঁসেল থেকে শুরু করে ছোট-বড় রেস্তরাঁয় রান্নার খরচ বাড়ছে। বাংলায় পেঁয়াজের দাম কোথায় দাঁড়িয়ে, কেন প্রভাব পড়ছে এই রাজ্যে? কবে নাগাদ সুরাহা মিলতে পারে? খোঁজ নিল এই সময় অনলাইন।
বহরমপুর কোর্ট বাজারের সবজি বিক্রেতা গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘মাস খানেক আগে সুখসাগর ও নাসিকের গাউটি পেঁয়াজের খুচরো বাজার দর ছিল কিলো প্রতি ১৫-১৬ টাকা। এখন সুখসাগর পেঁয়াজ পাইকারি কিনতে লাগছে কিলো প্রতি ৪০-৪৫ টাকা আর নাসিকের পেঁয়াজ ৪৫-৪৮ টাকা। বাজারে খুচরো বিক্রি করছি ৫০-৫৫-৬০ টাকায়।’
একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেঁয়াজের দাম এ ভাবে বেড়ে যাওয়ার পিছনে রয়েছে অতিবৃষ্টি। মহারাষ্ট্র দেশের মধ্যে অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদক রাজ্য। রবি মরশুমের পেঁয়াজ সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে তোলা হয় এবং তার পরের বেশ কিছু মাস সেই পেঁয়াজ মজুত করে ব্যবহার করা হয়। এ বার চাষের সময়ে আবহাওয়াজনিত কারণে ফসলের উৎপাদন ধাক্কা খেয়েছে। তার জের এসে পড়ছে খুচরো বাজারে। চাষের গোটা চক্রে ধাক্কা লাগায় বাজারে জোগান নিয়ে সমস্যা হয়েছে। বহরমপুরের নতুন বাজার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন-এর কর্তা দেবু ভকত জানান, টানা বৃষ্টি, কোথাও বন্যা পরিস্থিতি-সব মিলিয়ে তুলনায় আমদানি কম হচ্ছে। চাহিদার সঙ্গে জোগানের ফারাক থাকায় দাম বেড়েছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব গাড়ি ভাড়ায় পড়েছে বলেও জানান তিনি।
এরই সঙ্গে রয়েছে মজুত সংক্রান্ত সমস্যাও। ভারতে উন্নতমানের মজুতের সুবিধার অভাবে প্রতি বছর বহু খাদ্যশস্য নষ্ট হয় বলে নানা স্তরে আলোচিত। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও সেই বিষয়টি রয়েছে। পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখার অভাব জোগানের ঘাটতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন দেবু ভকত।
পাইকারি বাজারে যেহেতু দাম বাড়ছে, তার প্রভাব পড়ছে খুচরো বাজারেও। যেহেতু একদিকে ফলন কম হয়েছে, অন্যদিকে বৃষ্টির জেরে চাষ পিছিয়ে গিয়েছে। তার ফলে মাঝে এমন সময় চলে এসেছে তার জেরে বাজারে জোগান কমে গিয়েছে। বহরমপুরের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী রাকেশ প্রসাদ জানান, সুখসাগর পেঁয়াজ প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল নাগাদ ওঠে এবং সংরক্ষণ করে নভেম্বর পর্যন্ত বেচাকেনা চলে। কিন্তু এই বছর সুখসাগর পেঁয়াজের ফলন ভাল হয়নি। সুখসাগরের পাশাপাশি নাসিক, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের গাউটি পেঁয়াজের ফলনও ভাল হয়নি অতিবৃষ্টির কারণে। ফলে চাহিদা ও জোগানের ব্যাপক পার্থক্য ধরা পড়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ ভেন্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কমল দে জানাচ্ছেন, নাসিকে যত পেঁয়াজ হয়, তার বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গে আসে। যেহেতু নাসিক থেকে পেঁয়াজের জোগান চাহিদার তুলনায় কমেছে তার প্রভাব পড়ছে বাংলায়। কমল দে জানাচ্ছেন, বাংলাতেও পেঁয়াজ চাষ হয়। আগের তুলনায় পেঁয়াজে এই রাজ্যের স্বনির্ভরতা অনেকটাই বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘৬-৭ মাস আমাদের রাজ্যে যা পেঁয়াজ হয়, তা দিয়ে চলে যায়। বাকি মাসগুলির জন্য আমদানি করতে হয়।’ এখন আমদানি যেখান থেকে করতে হয়, সেখান থেকে জোগান কমে গিয়ে দাম বাড়ছে। তাহলে কি পুজোর মুখে আরও দাম বাড়বে? আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী রাকেশ প্রসাদ। তিনি বলেন, ‘সুখসাগর পেঁয়াজ এখনও বাজারে রয়েছে বলে ভিন রাজ্যের পেঁয়াজ আমরা এখন প্রতি দিন ৬০টন আমদানি করছি। মাস খানেকের মধ্যে সুখসাগর শেষ হয়ে গেলে ভিন রাজ্য থেকে ২৫০-৩০০ টন আমদানি করতে হবে। তখন দর আরও বাড়বে।’
রাকেশ প্রসাদ বলেন, ‘অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটক থেকেও পেঁয়াজ আসে। কিন্তু গত তিন-চার বছর বন্যায় পেঁয়াজ চাষ করে ক্ষতি হওয়ায় এ বছর ৫০ শতাংশ চাষি ওই চাষ করেছেন। ফলে সেখানেও ঘাটতি রয়েছে। নতুন লাল পেঁয়াজ না ওঠা পর্যন্ত দর বাড়বে মনে হয়।’ একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন কমল দে। তিনি জানান, নতুন ফলন বাজারে এসে দাম কমতে জানুয়ারি হয়ে যেতে পারে। তাহলে কি পুজোর সময়ে এবং তার পরেও আমজনতার পকেটে ছ্যাঁকা দেবে পেঁয়াজ?
দাম নাগালে রাখতে কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করেছে। সরকার বাফার স্টক থেকে পেঁয়াজ বাজারে ছাড়ছে। চালানো হচ্ছে ‘Kanda Express’। রাজ্যের প্রশাসনও পদক্ষেপ করেছে। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নির্দেশ দিয়েছেন সরকারি আধিকারিকদের বাজার পরিদর্শন করার। বেআইনি ভাবে মজুত করে রাখলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। বাজারে ঘুরে নজরদারি ছবি দেখা গিয়েছে মঙ্গলবার। কিন্তু দাম কমবে কবে? সেদিকে তাকিয়ে আমনাগরিক।
তথ্য সহায়তা: শুভাশিস সৈয়দ