• কিপলিংয়ের চিঠিতে অমূল্য রত্ন, নাড়ির যোগ কলকাতার
    এই সময় | ২৬ আগস্ট ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজ়িয়াম কর্তৃপক্ষের থেকে বিশেষ ওই চিঠিটি তাঁর বইতে ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছেন আইআইটি হায়দরাবাদের ডিপার্টমেন্ট অফ লিবারাল আর্টস এবং ডিপার্টমেন্ট অফ ডিজ়াইনের অধ্যাপিকা সুহিতা ভট্টাচার্য। তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘এক্সপ্লোরিং দ্য নন হিউম্যান অ্যান্ড রিলিজিয়ন ইন নাইটিন্থ সেঞ্চুরি রাইটিংস’ বইটি কলোনিয়াল যুগে ইউরোপে ভারতের ধর্মীয় সামগ্রীগুলো কী ভাবে শিল্পদ্রব্যের মর্যাদা পেয়েছিল—সে বিষয়ে বহু অজানা তথ্যের সন্ধান দিয়েছে। ওই বইতেই বহু দুষ্প্রাপ্য শিল্পদ্রব্যের ছবির পাশাপাশি ছাপা হয়েছে র‌্যডিয়ার্ড কিপলিংয়ের লেখা একটি অতি দুর্লভ চিঠিও।

    ১৯১৭–র ২৮ জুলাই কিপলিং সাসেক্সের বেটম্যানস এস্টেট–এ বসে একটি চিঠি লেখেন লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজ়িয়ামে। চিঠিতে তিনি তাঁর প্রয়াত বাবা, জন লকউড কিপলিংয়ের সংগ্রহে থাকা একটি জিনিস মিউজ়িয়ামকে দান করার প্রস্তাব দেন। সেটি ছিল একটি বড় স্ক্র্যাপবুক। ১৮৭৫–এ ভারতে এসে লাহোরের ‘মেয়ো কলেজ অফ আর্টস’–এর কিউরেটরের দায়িত্ব নেন লকউড কিপলিং। পরের কয়েক বছর ধরে তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ধরনের মূর্তি, ছবি, লিথোগ্রাফ, খোদাই, কালীঘাটের পট ও অন্য নানা ধরনের শিল্প ও ধর্মীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেছিলেন। সেই সংগ্রহগুলোই তিনি দিতে চেয়েছিলেন মিউজ়িয়ামকে।

    লকউড কিপলিংয়ের ওই বিরল সংগ্রহের সঙ্গে কলকাতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৮৮৩-র ৪ ডিসেম্বর থেকে ১৮৮৪–র ১০ মার্চ পর্যন্ত কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজ়িয়াম চত্বর এবং ময়দান মিলিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। সেটাই ছিল ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। সেখানে বেলজিয়াম, সিংহল, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, তুরস্ক এবং ইউএসএ–র মতো ৩৭টি দেশ অংশ নিয়েছিল। ওই প্রদর্শনীতে ‘পাঞ্জাব কোর্ট’–এর প্রদর্শনের দায়িত্বে ছিলেন লকউড কিপলিং। পরে এই প্রদর্শন সামগ্রীর অনেকটা অংশই লন্ডনে চলে যায়।

    যার বেশ কিছুটা জায়গা পায় ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজ়িয়ামে। আর লকউড কিপলিংয়ের নিজস্ব স্ক্র্যাপবুকে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন বিভিন্ন ভারতীয় মূর্তির চিত্র, যার মধ্যে উল্লেখ্য ছিল কালীঘাটের পটচিত্র। সেটির এই মিউজ়িয়ামে জায়গা হয় ১৯১৭–য়, তাঁর ছেলের লেখা চিঠিটির হাত ধরে। পাশাপাশি গোটা উনিশ শতক জুড়েই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালেক্টরস এবং বিভিন্ন মিশনারি সোসাইটির হাত ধরে ভারতীয় মূর্তি পৌঁছচ্ছিল বিভিন্ন ব্রিটিশ জাদুঘরে। তার মধ্যে প্রায় অনাবিষ্কৃত ছিল লন্ডন মিশনারি সোসাইটি মিউজিয়ামের সংগ্রহ, যা উঠে এসেছে সুহিতার কাজের মাধ্যমে। তিনি তাঁর বইতে দেখিয়েছেন যে, এই ধরনের মূর্তি এই জাদুঘরে প্রথম পৌঁছয় ১৮১৯–এ, বেঙ্গল অক্সিলিয়ারি মিশনারি সোসাইটির উদ্যোগে।

    ওই সব সামগ্রীকে কেমন ভাবে দেখা হতো, সেটাই সুহিতা জানিয়েছেন তাঁর বইতে। তিনি ‘এই সময়’–কে বলেন, ‘আমি পুরো বিষয়টা ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানোর চেষ্টা করেছি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যে লকউড কিপলিংয়ের ওই সংগ্রহ জায়গা পেল ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজ়িয়ামে, যেখানে ওই সামগ্রীগুলিকে দেখা হয়েছিল শিল্প সামগ্রী হিসেবে। কিন্তু লন্ডন মিশনারি সোসাইটি নিজে ধর্মীয় সংগঠন হওয়ার জন্যই হয়তো এই ধরনের সামগ্রীকে ধর্মীয় সামগ্রী হিসেবেই দেখেছিল।’ এই কারণেই সুহিতা তাঁর বইতে ওই সামগ্রীগুলিকে ‘আইডল অবজেক্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

    সুহিতা জানাচ্ছেন, ওই সংগ্রহ দিয়েই একটা মাঝারি মাপের প্রদর্শনী করা সম্ভব। তাতে ছিল ভারতীয় লোকশিল্পের একটি অ্যালবাম। এতে ২৩৩টি প্রিন্ট, চিত্রকর্ম এবং কলম-পেনসিলের আঁকা স্কেচ রয়েছে। ভারতীয় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, নাট্যদৃশ্য এবং অমৃতসর ও লাহোরের বিভিন্ন আঞ্চলিক দৃশ্য তাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি ছিল পৌরাণিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তু। এই সংগ্রহে জনপ্রিয় হিন্দু ও শিখ পুরাণ, কিংবদন্তি এবং স্থানীয় লোককথার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা রকমের শিল্পকর্ম রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ক্যালিগ্রাফি-ভিত্তিক আঁকাও। ৩৭টি আলাদা পাতায় কালি দিয়ে আঁকা বিভিন্ন ছবিকে এই তালিকায় ফেলা যায়। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই অঙ্কনগুলিতে নানা ধরনের পশু ও পাখির ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর ছিল গান্ধার শিল্পের বিভিন্ন প্রত্নসামগ্রীও। গান্ধার অঞ্চল থেকে পাওয়া দুর্লভ বৌদ্ধ ভাস্কর্য—বিখ্যাত ‘ফাস্টিং বুদ্ধ’–র মতো শিল্পকর্মও এর অন্তর্ভুক্ত।

    ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজ়িয়াম ও লন্ডন মিশনারিজ় সোসাইটির মহাফেজখানায় রাখা ভারতীয় শিল্পদ্রব্যের অমূল্য ভাণ্ডার নিয়ে ইতিপূর্বে তেমন কোনও কাজই হয়নি বলা যায়। তাই সুহিতার বইটি যে আগ্রহীদের কাছে অজানা এক দুনিয়ার দরজা খুলে দেবে, এমনটা বলাই যায়।

  • Link to this news (এই সময়)