• বিচার কবে পাব? ‘চুরির অপবাদ’ মনে পড়তেই কেঁদে ফেললেন চিপস কাণ্ডের সেই কিশোরের মায়ের
    এই সময় | ২৬ আগস্ট ২০২৬
  • দিগন্ত মান্না

    ছেলেটা নেই, এক বছরেরও বেশি কেটে গিয়েছে। কিন্তু বিচার পাওয়া তো দূর অস্ত, মূল অভিযুক্ত এখনও বহাল তবিয়তে বাইরে। এ দিকে, ছেলেকে হারিয়ে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে মা-বাবার জীবন। পড়ার ঘর থেকে উঠোন, সর্বত্র ছেলের স্মৃতি একটা সময়ের পরে এতটাই অসহ্য লেগেছিল যে, সেই বাড়িই ছেড়ে দিয়েছেন মা-বাবা। নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছেন। একমাত্র মেয়ের মায়াভরা মুখখানার দিকে চেয়ে বাঁচার রসদ খোঁজার চেষ্টা করছেন দু’জনে। তার পরেও হোসিয়ারিতে মেশিনের চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে প্রায়ই ঝাপসা হয়ে আসে মায়ের দু’চোখ। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতেই ধরা গলায় এই সময় অনলাইনকে মা বললেন, ‘আমরা কি আর বিচার পাব না?’

    ২০২৫ সালের ১৮ মে-র ঘটনা। পাঁশকুড়া থানা এলাকায় একটি মিষ্টির দোকানের সামনে থেকে চিপসের তিনটি প্যাকেট কুড়িয়ে পেয়েছিল বছর তেরোর ওই কিশোর। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোকানদার মোটরসাইকেল চেপে এসে তাকে মাঝরাস্তায় ধরে। প্রথমে কান ধরে ওঠবস। তার পরে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি। শেষমেশ পকেটে থাকা কুড়ি টাকার নোট দিয়ে রেহাই পেয়েছিল ছেলেটি। কিন্তু তত ক্ষণে বেশ কয়েক বার ‘চোর’ অপবাদ শুনতে হয়েছে তাকে।

    পড়শিদের কাছে ঘটনাটি জেনে ছেলেকে মিষ্টির দোকানে নিয়ে গিয়েছিলেন মা। বাজার ভর্তি লোকের সামনে ছেলেকে ধমক দেন। একটি চড়ও মারেন গালে। ছেলেটি বার বার মাকে বলেছিল, সে চুরি করেনি। কেউ ছিল না বলে কুড়িয়ে নিয়েছিল। সেই ঘটনার পরেই কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করে সপ্তম শ্রেণির ওই ছাত্র। সুইসাইড নোটে লিখে গিয়েছিল, ‘মা, আমি চুরি করিনি’।

    এই কথাটাই ভুলতে পারেন না মা। প্রতি মুহূর্তে কথাটা মনে পড়ে। চোখের জল সামলাতে সামলাতেই বলছিলেন, ‘কিন্তু দোকানদারের চোর বলাটা ও মেনে নিতে পারেনি। বার বার বলেছিল: কাকু, আমি কিন্তু চুরি করিনি!’

    কিশোরের মৃত্যুর পরে উত্তাল হয়েছিল পাঁশকুড়া। শোরগোল পড়ে গিয়েছিল গোটা রাজ্যেই। অভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়ারের বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ দেখান স্থানীয়েরা। অভিযোগ, ভাঙচুরও চালানো হয় অভিযুক্তের বাড়িতে। অভিযুক্তকে পুলিশ আড়াল করতে চাইছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন গ্রামবাসীরা। তার পরেই অভিযুক্ত সিভিক-সহ তাঁর পরিবারের চার জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়। তার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু কিছু দিন পরেই জামিন পেয়ে যান ওই সিভিক ভলান্টিয়ার।

    ঘটনার জেরে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় একাধিক গ্রামবাসীকে। অভিযোগ তৎকালীন পাঁশকুড়া থানার আইসি সমর দে পরিবারের থেকে কিশোরের দেহ কার্যত ছিনিয়ে নিয়ে দাহ করে দেন। কিশোরের মৃত্যুর পরে অভিযুক্তকে আড়াল করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে বিজেপি, কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট। ওই বছর ২৫ মে পাঁশকুড়া থানায় অভিযুক্ত শুভঙ্কর দীক্ষিত-সহ তাঁর পরিবারের চারজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেন মৃতের মা। অভিযোগ দায়ের হওয়ার ১৬ দিন পরে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পাঁশকুড়া থানার পুলিশ। পরে শুভঙ্কর জামিন পেয়ে যান।

    মৃত কিশোরের মা জানান, অভিযুক্ত আজও সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরিই করেন। কিন্তু যা ক্ষতি হওয়ার, তাঁদেরই হলো! মায়ের কথায়, ‘ছেলেটা নেই। ওকে তো আর কোনও দিন ফিরে পাব না। অভিযুক্ত চাকরিতে দিব্যি বহাল। আর আমরা আদালতের চক্কর কেটে মরছি! শুধু তারিখের পর তারিখ?’ প্রসঙ্গত, তমলুক আদালতে এই মামলা চলছে। চার্জশিট জমা পড়েছে গত বছর সেপ্টেম্বরে। এখন চলছে বিচারপ্রক্রিয়া।

    স্ত্রীর কথা শুনে ততক্ষণে চোখে জল স্বামীরও। হাতের চেটোয় চোখ মুছতে মুছতে ছেলেটির বাবা বলেন, ‘মামলার দিনে সমস্ত কাজ ফেলে আদালতে ছুটতে হয়। টাকা আর সময় দুই-ই নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু শাস্তি হচ্ছে না অভিযুক্তদের। আমরা চাই বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হোক।’

    গত বছর ঘটনার পরে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল বিজেপি, সিপিএম এবং কংগ্রেস। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন তাঁরা। কিন্তু এখন আর কোনও রাজনৈতিক দলের কাউকে দেখা যায় না বলেও অনুযোগ স্বামী-স্ত্রীর। পাঁশকুড়া পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক সিন্টু সেনাপতি যদিও বলেছেন, ‘ঘটনার সময় থেকেই আমরা দলীয় ভাবে ওই পরিবারের পাশে ছিলাম। এখনও আছি। ওই কিশোরের পরিবার যাতে বিচার পায়, তার জন্য সমস্ত রকমের চেষ্টা করব।’

  • Link to this news (এই সময়)