এই সময়: ভারতে নাশকতা চালাতে পাক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) নয়া হাতিয়ার এ বার ‘সাইবার জিহাদ’! পহেলগাম হামলা নিয়ে যে চার্জশিট জমা দিয়েছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ), সেখানেই এই ‘সাইবার জিহাদ’-এর প্রসঙ্গ রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
চার্জশিটে এনআইএ জানিয়েছে, পহেলগাম হামলাই ছিল এই ‘সাইবার জিহাদ’-এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যে ভাবে সাইবার দুনিয়াকে কাজে লাগিয়ে হামলার পুরোটা আইএসআই নিয়ন্ত্রণ করেছিল, তেমন নমুনা পহেলগাম হামলার আগে দেখা যায়নি বলেই বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের দাবি। গত বছর ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে বৈসরন উপত্যকায় নাশকতার কমবেশি আড়াই ঘণ্টার মধ্যে হামলার দায় স্বীকার করেছিল ‘দ্য রেজ়িস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ)। তারা এই স্বীকারোক্তি পাঠিয়েছিল বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলে।
কিন্তু ২৫ এপ্রিল রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ পহেলগাম হামলার তীব্র নিন্দা করে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করতেই রাতারাতি ভোল পাল্টে টিআরএফ গোটা দায় ঝেড়ে ফেলে। দায় স্বীকার করে লেখা পোস্ট মুছে ফেলা হয় সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। পরিবর্তে চলে আসে নতুন ন্যারেটিভ — টিআরএফ কোনও ভাবেই দায় স্বীকার করেনি। কোনও পোস্টও করেনি। তা হলে কারা করল এই কাজ? টিআরএফ দাবি করে, তাদের টার্গেট করে ভারতীয় নিরাপত্তা এজেন্সিগুলিই ওই পোস্ট করেছিল।
এখানেই ‘সাইবার জিহাদ’-এর কারিকুরি খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, নিজেদের দায়মুক্ত করার পাশাপাশি ভারতীয় এজেন্সিগুলির উপরে দায় চাপাতে টিআরএফ ব্যবহার করেছিল একটি স্বয়ংক্রিয় টেলিগ্রাম চ্যাটবটের। যা ছিল আইএসআই-এর ‘সাইবার জিহাদ’-এর অবদান।
কী ভাবে জঙ্গিদের সাইবার-ঢাল হয়ে উঠেছিল পাক গুপ্তচর সংস্থা? সূত্রের খবর, এনআইএ জানিয়েছে, জঙ্গিদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ (কম্যান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, অর্থাৎ নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য) নিশ্চিত করতে পৃথক সার্ভার তৈরি করে আইএসআই, যা গোটা সিস্টেমের শিরদাঁড়ার মতো কাজ করেছিল। এর পরে ভিপিএন গেটওয়ের মাধ্যমে জঙ্গিদের এবং আইএসআই কন্ট্রোল রুমের মধ্যে নিরাপদ এবং এনক্রিপ্টেড সংযোগ তৈরি করা হয়।
দু’প্রান্তের যোগাযোগে যাতে কেউ আড়ি পাততে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয় ‘সিম্যাক নোড’। এর সবথেকে বড় সুবিধে হলো, কোনও ভাবে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটলে (যেমন আড়ি পাতা বা লিঙ্ক ফেলিওর), আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে এই অ্যালগরিদম নিজে থেকেই সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প পথ বের করে নেয়। এনআইএ-র বক্তব্য, এই ‘সিম্যাক’ রাখা হয়েছিল পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার দু’টি জায়গায়। গোটা ব্যবস্থায় ইন্টারনেট পরিষেবা নেওয়া হয়েছিল স্থানীয় সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাছ থেকে।
তদন্তকারীদের বক্তব্য, নিজেদের আড়ালে রাখতে ইউকে এবং ইউএসএ থেকে আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল সিম এবং বিপুল পরিমাণে ভয়েসওভার ইন্টারনেট প্রোটোকল (ভিওআইপি) লাইন সংগ্রহ করেছিল আইএসআই। এর ফলে পহেলগামের জঙ্গিদের হ্যান্ডলাররা নিজেদের পৃথক স্থানীয় ডিজিটাল আইডেন্টিটি তৈরি করে ফেলেছিল। রাওয়ালপিন্ডি (আইএসআই-এর সদর দপ্তর এখানেই) থেকে পুরোটা নিয়ন্ত্রিত হলেও, সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ লোপাটের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল এ ভাবেই।
উচ্চ কম্পাঙ্কের (হাই ফ্রিকোয়েন্সি) ডিজিটাল ম্যাপিং থেকে তদন্তকারীদের নজরে আসে, খালিস্তানি এবং কাশ্মীর-কেন্দ্রীয় হ্যান্ডলগুলির মধ্যে পোস্ট করার নির্দিষ্ট সময়সূচির একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। সূত্রের খবর, সেখান থেকেই প্রথম বোঝা যায়, রাওয়ালপিন্ডির একটি বিশেষ ওয়াররুমই হলো এই গোটা সাইবার-জালের কেন্দ্রবিন্দু।