সুমন ঘোষ
দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলে থাকতে থাকতে হাতির জীবনযাত্রায় এখন ঢের পরিবর্তন এসেছে। বদলেছে। খাদ্যাভ্যাসও। তার জেরে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি দিনে এক থেকে দেড় কুইন্টাল পর্যন্ত খাবার খেতে পারে। দক্ষিণবঙ্গে বর্তমানে ১৮০-১৯০টি হাতি রয়েছে। ফলে সহজেই অনুমেয়, তাদের দিনে কত খাবার প্রয়োজন। দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলও এত গভীর বা হাতির খাবার জোগানের উপযোগী নয়। ফলে খাবারের সন্ধানেই তারা রাতের অন্ধকারে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পড়ে। মাঠে থাকা ধান, আনাজ খেয়ে, মাড়িয়ে নষ্ট করে। গ্রামেও ঢুকে পড়ে খাবারের সন্ধানে। বাড়ি ভাঙচুর করে। হাতির সামনে পড়ে মৃত্যু হয় মানুষেরও। ফলে হাতি-মানুষ সংঘাত তীব্র হচ্ছে। তার জেরে মৃত্যু হচ্ছে হাতিরও।
রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক প্রভাতকুমার শীট এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত হাতির হানায় মৃত্যু হয়েছিল ১১৪ জনের। আর শস্যহানি বা বাড়ি ভাঙার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৫৯.৯৯ লক্ষ টাকা। আবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে মানুষের কারণে ১২-১৫টি হাতির মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৫-র তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণবঙ্গে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৬-য় মারা যান ১৮ জন। হাতি মারা যায় ৪টি।
বন দপ্তর সূত্রে খবর, দক্ষিণবঙ্গে প্রতি বছর হাতির হানায় গড়ে ৩১-৫০ জনের মৃত্যু হয়। ২১০০-২৫০০ হেক্টর জমির শস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন চার থেকে ছ'হাজার চাষি ও সাধারণ মানুষ। বাড়ি ভেঙেছে ১৫০০-২০০০। আবার, প্রতি বছর হাতি মারা যায় গড়ে ১৫-২০টি। ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১১৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কারণ কখনও দুর্ঘটনা, কখনও হাতি-মানুষ সংঘাত।
সংঘাত বাড়ছে কেন? 'রেসিডেনশিয়াল' হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢোকে। তাতেই মানুষের মৃত্যু আর বাড়ি ভাঙার ঘটনা ঘটে। আর মাঠে নেমে পাকাধান, বীজতলা, তিল, আলু, নানা রকম আনাজ খেয়ে, মাড়িয়ে নষ্ট করে। আবার জঙ্গলে হাতি থাকার কারণে লোকজন ভয়ে আগের মতো শালপাতা, জ্বালানি কাঠ, মহুয়া ফুল-সহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে পারেন না। ছাতু (মাশরুম) তুলতে যেতেও ভয় পান। আবার জঙ্গলমহলের বহু আদিবাসী পরিবারের সংস্কৃতি ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাঁড়িয়া বা মহুয়া থেকে তৈরি পানীয়। হাঁড়িয়া বা মহুয়ার গন্ধে তীব্র আকর্ষণ রয়েছে হাতিরও। ফলে ঘর ভেঙে পানীয় বের করে, নষ্ট করে সঞ্চিত সামগ্রীও। একদিকে ক্ষতি বাড়ছে আর অন্যদিকে কমছে আয়। ফলে সংঘাতও বাড়ছে। অধ্যাপক প্রভাতকুমার শীটের মতে, 'মানুষ-হাতি সংঘাতকে শুধু মৃত্যু, আহতের সংখ্যা বা ফসলের ক্ষতির হিসাব দিয়ে দেখা ঠিক নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে লোকজনের মানসিক স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও।'
তা হলে হাতি-মানুষের সংঘাত এড়াতে কোন পথে চলতে হবে? নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিএফও বলছেন, 'হাতিকে জঙ্গলে আটকে রাখার জন্য হাতির পছন্দের খাবার হিসেবে পরিচিত গাছ রোপণ করতে হবে। জলাধার তৈরি হয়েছে। কিন্তু, হাতির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং বছরভর তারা থেকে যাওয়ায় জঙ্গলের খাবারে টান পড়ছে।'
আর এক বনকর্তার কথায়, 'হাতির খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। শাল, পিয়াল, কুসুম, কলাগাছ ছেড়ে তারা এখন পাকা ধান, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন থেকে টোম্যাটো- সবই খাচ্ছে। ফলে স্বাদ বদলাতেও তারা জঙ্গল ছেড়ে মাঠে নামছে, লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এর থেকে বেরোনোর যে কী উপায়, তা তো আমরাও ভেবেচিন্তে কূল পাচ্ছি না।'