এই সময়, মালদা: ভোরের আলো ফুটতেই ঘুম ভাঙে তাঁর। কাকের ডাকই যেন আজও ঘড়ির কাঁটা। কিছুটা বাঁক-ধরা শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে পড়েন। তারপর উঠোনে জল ছিটিয়ে ঝাড় দেন। বয়স ১০০ পেরিয়েছে। অথচ দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সংশোধনাগারে কাটানোর অভ্যেস ত্যাগ করতে পারেননি মালদার ভুতনির দক্ষিণ চণ্ডীপুরের বৃদ্ধরসিকচন্দ্র মণ্ডল।
আধার কার্ড অনুযায়ী তাঁর বয়স ১০৫ বছর। রসিকচন্দ্র যাবজ্জীবন সাজা থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েছিলেন দু'বছর আগে। তখন থেকেই জামিনে ছিলেন বাড়িতে, তবে পুরোপুরি মুক্তি পাননি। ১৯ অগস্ট আদালত তাঁকে পূর্ণ মুক্তি দিয়েছে। স্ত্রী মিনা মণ্ডল, চার ছেলে, পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে এখন সত্যিই তাঁর স্বাধীন জীবন। তবে ৩৬ বছরের কারাজীবনের অভ্যেস এখনও তাঁকে ছাড়েনি।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে তাঁর চাই আদা দিয়ে এক কাপ লাল চা ও শুকনো মুড়ি। ঠিক ১১টার মধ্যেই খেয়ে ফেলেন ভাত। এরপর স্ত্রীকে পাশে নিয়ে ঘরে বসে গল্প করেন। দুপুরে ঘুমিয়ে নেন। বিকেলে হাতে লাঠি নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান বাড়ির পাশের নিজের জমিতে। সেখানে ছেলে ও নাতি-নাতনিদের কৃষিকাজ দেখেন।
ঘরে টেলিভিশন চলে। কিন্তু টিভি দেখায় আগ্রহ নেই। এই বয়সেও চোখে চশমা পরেন না। দাঁত অবশ্য পড়ে গিয়েছে। মাথায় খানিকটা পাকা চুল, মুখে পাতলা দাড়ি। শুকনো, সটান চেহারা। ৩৪ বছর জেলে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন ২০২৪-এ। এর নেপথ্যে রয়েছে খুনের মামলা। ১৯৮৮-তে জমি বিবাদকে কেন্দ্র করে নিজের ভাই সুরেশ মণ্ডলকে গুলি করে খুন করার অভিযোগ উঠেছিল দাদা রসিকের বিরুদ্ধে। মানিকচক থানার দক্ষিণ চণ্ডীপুরের এই ঘটনায় আদালত রসিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের দেয়। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৭০ বছর। এর পর থেকে তাঁর ঠিকানা মালদা সংশোধনাগার।
২০২৪-এ বার্ধক্যজনিত কারণে রসিকের জামিন হয়। তার পর থেকে বাড়িতে। তবু তাঁকে পুরোপুরি মুক্ত করার জন্য পরিবারের লড়াই থামেনি। রসিকের ছেলে ও নাতি-নাতনিরা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে যান। তারই ফলে ১৯ অগস্ট পূর্ণ মুক্তিলাভ। বয়সের ভার এবং বার্ধক্য বিবেচনায় এই মুক্তি।
রসিকের স্ত্রী মিনা মণ্ডলের বয়স প্রায় ৯০-এর কাছাকাছি। তাঁদের চার ছেলে। দীপক, উত্তম, তরুণ এবং প্রকাশ। প্রায় ১০ কাঠা জমির উপরে একান্নবর্তী পরিবার। কেউ চাষবাস করেন, কেউ দিনমজুরি। প্রকাশ মণ্ডল বলেন, 'বাবার বয়স যখন ৯৫ বছর হয়, তখন থেকে তাঁকে মুক্ত করার জন্য আমরা ছোটাছুটি শুরু করি। ফৌজদারি আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের পরে জেলবন্দিদের মুক্তির সুযোগ রয়েছে। সেই সূত্র ধরেই সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ।'
রসিকের নাতি আশিস মণ্ডল বলেন, 'দাদু ফিরে আসায় আমরা খুশি। বাবা ও কাকারা দাদুকে ফিরিয়ে আনার জন্য সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছেন।' মুক্তি পেয়ে কি শান্তি খুঁজে পেয়েছেন রসিক? এ প্রশ্ন করলে সে ভাবে জবাব দিতে পারেন না রসিক। বন্দি ও মুক্ত জীবনের মধ্যে থাকা কোনও ধূসর রেখার মধ্যে যেন আটকে পড়েন শতায়ু প্রবীণ।প্রকাশ বলেন, 'নিজের মনেই মাঝেমধ্যে কী যেন বিড়বিড় করে বলেন বাবা। কখনও ফুঁপিয়ে কাঁদেন। ৩৬ বছর বন্দি ছিলেন, কম সময় তো নয়। তাই যেন মুক্তির স্বাদ নিতে তাঁর কষ্ট হয়।'