ট্রাইব্যুনালের ট্রেন্ড বলছে, বাদ যাওয়া ভোটারদের ৯০ শতাংশেরই নাম ফিরছে ভোটার তালিকায়: বাংলায় কি তবে প্রহসন হল? ফের বিতর্ক
দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৭ আগস্ট ২০২৬
লোকসভা ভোটের আগে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) নিয়ে গোটা রাজ্য তোলপাড় হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ার জের এখনও কাটেনি। বরং ট্রাইব্যুনালে (Tribunal) জমা পড়া আবেদনের নিষ্পত্তি নিয়ে সামনে এল নতুন পরিসংখ্যান। আর তা নিয়েই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
তথ্যের অধিকার আইনে (RTI) পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে সংশোধনের পরে ট্রাইব্যুনালে মোট আবেদন জমা পড়েছিল ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার ৬২০টি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৮২ হাজার ৭৮২টি আবেদনের। শতাংশের হিসাবে যা মেরেকেটে দুই শতাংশের সামান্য বেশি। বাকি প্রায় ৩৭ লক্ষ ২৭ হাজার আবেদন এখনও ঝুলে রয়েছে।
তবে যেটুকু নিষ্পত্তি হয়েছে, তার ফলাফল লক্ষণীয়। নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের মধ্যে ৭৫ হাজার ৪৪৩টি ক্ষেত্রে ভোটারের নাম ফের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, বাদ পড়েছে মাত্রই ৭ হাজার ৩৩৯টি নাম। অর্থাৎ নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের প্রায় ৯১ শতাংশই ফের সসম্মানে তালিকায় ফেরত এসেছেন।
এই তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন দক্ষিণ মালদহের কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী। অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মী প্রসেনজিৎ বসুর দায়ের করা একটি আবেদনের সূত্র ধরে এই তথ্য সুপ্রিম কোর্টেও (Supreme Court) জমা পড়ে।
শীর্ষ আদালতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহানার বেঞ্চে বিষয়টি ওঠে। আবেদনকারীর আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতে জানান, নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) তরফে এই তথ্য নিজে থেকে আদালতে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। আরটিআইয়ের মাধ্যমেই বিষয়টি সামনে এসেছে।
তিনি আরও জানান, প্রায় সাত লক্ষ আবেদন এসেছে সরাসরি বাদ পড়া ভোটারদের কাছ থেকে। বাকি আবেদনের সিংহভাগ জমা দিয়েছে খোদ নির্বাচন কমিশন কিংবা অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করা আপত্তিকারীরা। জেলাভিত্তিক ছবিতেও বিস্তর ফারাক ধরা পড়েছে। যেমন মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে বেশি ৭ লক্ষ ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়া সত্ত্বেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৮৭টির।
আদালত নির্বাচন কমিশনকে হলফনামা দিয়ে মোট বকেয়া আবেদনের সংখ্যা, বাদ পড়া ও অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত আবেদনের পৃথক হিসাব এবং নিষ্পত্তির পরে তালিকা আপেডট সম্পর্কিত পদক্ষেপ জানাতে নির্দেশ দিয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসতেই সমাজমাধ্যমে সরব হয় কংগ্রেস (Congress)। দলের অফিশিয়াল হ্যান্ডল থেকে দাবি করা হয়, ভোটের আগে নিবিড় সংশোধনের নামে যে নাম কাটা হয়েছিল, ভোট মিটতেই তা আবার ফিরিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে গোটা প্রক্রিয়াটাই ছিল পরিকল্পিত। কংগ্রেসের ভাষায় এটি প্রধানমন্ত্রী মোদী ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভোট চুরির কৌশল।
একই পোস্টে টেনে আনা হয়েছে দুই মাস আগে দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরে একটি সরকারি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গও, যেখানে বিধানসভা ভোটে ব্যবহৃত প্রায় চার হাজার ইভিএম (EVM) পুড়ে যায়। কংগ্রেসের দাবি, এই ঘটনাও ওই একই ভোট কারচুপির অংশ।
পুরভোট (civic polls) সন্নিকটে থাকায় বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। বিরোধীদের যুক্তি, ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির হার এমন ঢিমেতালে চললে বহু প্রকৃত ভোটার আসন্ন নির্বাচনেও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেন। অন্য দিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে এবং প্রক্রিয়া চলছে নিয়ম মেনে।
সব মিলিয়ে এসআইআর নিয়ে বিতর্ক থিতিয়ে যায়নি, বরং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পরে তা নতুন মোড় নিয়েছে। কমিশনের হলফনামা জমা পড়লে ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।