• একজনের জন্য বরাদ্দ করা বাড়ি পেয়েছেন অন্যজন, তৃণমূলের আমলে আবাসে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ
    এই সময় | ২৭ আগস্ট ২০২৬
  • দিব্যেন্দু সরকার, আরামবাগ

    প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনা প্রকল্পে গরিবদের ঘর তৈরিতে বড়সড় অনিয়মের অভিযোগ সামনে এলো গোঘাটে। স্থানীয় ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এক সময় যাঁদের জব কার্ড রয়েছে, তাঁরাই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার বাড়ি পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের আমলে গোঘাটের পশ্চিমপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এমন অনেক মানুষ আবাসের ঘর পেয়েছেন, যাঁদের নামে কোনও জব কার্ড নেই। অন্যের জব দেখিয়ে তাঁদেরকে আবাস যোজনার টাকা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে, শুধু গোঘাটের ওই একটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেই প্রায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ অন্যের জব কার্ড দেখিয়ে আবাসের বাড়ি হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ, সবটাই হয়েছে টাকার বিনিময়ে। এ ভাবে আবাস প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে প্রশাসনের অন্দরে। ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে পঞ্চায়েত ও বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বঞ্চিতরা।

    স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক প্রশান্ত দিগার বলেন, 'সব কিছুই খতিয়ে দেখা হবে। কাউকেই রেয়াত করা হবে না। এত বড় একটা দুর্নীতি কী ভাবে হলো, কাদের মদতে হলো, সেটাও তদন্ত করা হবে। পুলিশ ও প্রশাসনকে সবটা জানানো হয়েছে। গোটা বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে এবং যাঁরা দোষী, তাঁদের শাস্তি পেতেই হবে।'

    পঞ্চায়েত দপ্তরের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, একশো দিনের কাজের প্রকল্পে যাঁরা মজুর হিসাবে কাজ করেন, মূলত তাঁদের জন্যই জব কার্ড ইস্যু করা হয়। প্রশ্ন উঠছে, প্রতিটি জব কার্ড যেখানে নির্দিষ্ট লোকের নামে ইস্যু করা হয়, সেখানে একজনের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা কী ভাবে অন্যের অ্যাকাউন্টে চলে গেল? এর পিছনে সরকারি আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যদিও পঞ্চায়েত সচিবের দাবি, সফটওয়‍্যারের কারসাজি করেই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

    স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি ওই পঞ্চায়েত এলাকায় সমীক্ষা করতে গিয়ে আবাস যোজনা প্রকল্পে ভুরি ভুরি অনিয়ম ধরা পড়ে। যেমন, একটি গ্রামে ২৩০ জনের নামে সরকারি আবাস বরাদ্দ হলেও, তার সুবিধা পেয়েছেন অন্য উপভোক্তারা। ফলে প্রকৃত দরিদ্র ও যোগ্য মানুষরা সরকারি আবাসের সুবিধে থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গোঘাটের পশ্চিমপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের রামানন্দপুর এলাকার বাসিন্দা ইসত্তর গায়েনের নামে বরাদ্দ হওয়া আবাসের বাড়ি পেয়েছেন মাতুজান বিবি। একই ভাবে, বাদশা মল্লিকের নামে বরাদ্দ হওয়া বাড়ি পেয়েছেন হাসিনা বিবি। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, এলাকার তৃণমূল নেতাদের মদতে এবং প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশে সরকারি আবাসের টাকা কার্যত লুট হয়েছে। স্থানীয় ব্লক প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সরকারি আবাস প্রকল্পে অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলি এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিজেপির দাবি, এলাকায় যাঁরা আবাসের বাড়ি পেয়েছেন, তাঁদের জব কার্ড-সহ সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখুক প্রশাসন। কোনও অনিয়ম হয়ে থাকলে টাকা ফেরানোর ব্যবস্থা করা হোক।

    প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, যে সব যোগ্য পরিবার এখনও আবাসের বাড়ি পাননি, তাঁরা আগামী ৩১ অগস্ট পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার গত আড়াই মাস ধরে রাজ্যের সর্বত্র আবাসের সমীক্ষার কাজ চলছে। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, যাঁরা এখনও সমীক্ষার আওতায় আসেননি, তাঁরা যেন স্থানীয় ব্লক প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু যাঁদের জব কার্ড আইডি ব্যবহার করে অন্যরা টাকা পেয়ে গিয়েছেন, তাঁরা আর নতুন করে আবেদন করতেও পারছে না। তারই প্রতিবাদে পঞ্চায়েতে গিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, যাঁরা এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। যাঁরা জালিয়াতি করে বাড়ি পেয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

    পঞ্চায়েত দপ্তর থেকে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে, আবাসের টাকা পাওয়ার জন্য তিনটি নথি আবশ্যক করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে, আধার কার্ড, ১০০ দিনের কাজের জব কার্ড এবং আবেদনকারীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিশদ বিবরণ।

  • Link to this news (এই সময়)