নিলয় ভট্টাচার্য
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-শীত। এই তিন মাস ভিড় জমে মুকুটমণিপুরে। ‘ফুটফল’ বাড়ে পর্যটকদের। বছরের বাকি সময়ে — তীব্র গরমের ঠেলায় কিংবা ঝোড়ো বর্ষায় — অনেকেই মুকুটমণিপুরমুখী হতে চান না। কিন্তু শীতের প্রিয় বা পছন্দের সময়েও ভাঙন ধরেছে পর্যটকদের ঢলে — স্থানীয় সূত্রের এ হেন তথ্যে এ বার বাড়ছে বিস্ময়। সেই সঙ্গে শঙ্কাও। কারণ আর আড়াই-তিন মাস পর থেকেই শীতের আমেজ গায়ে মেখে পর্যটকদের ভিড় বাড়ার কথা মুকুটমণিপুরে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ সালে প্রায় তিন লক্ষ পর্যটক গিয়েছিলেন মুকুটমণিপুরে। ২০২৫-২৬ সালে সেই সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়েছে। কেন পর্যটকদের সংখ্যায় ভাটা পড়েছে? স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, মুকুটমণিপুরে লেক, নৌকা বিহার ও ডিয়ার পার্ক ছাড়া আর কিছুই দেখার নেই। তাঁদের দাবি, নতুন করে আকৃষ্ট করার মতো কিছুই না থাকায় মুখ ফেরাচ্ছেন পর্যটকদের একটা বড় অংশ। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে নতুন শিল্প আনার উপর জোর দিয়েছে। সেই পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে পর্যটন শিল্পকেও।
বাঁকুড়া জেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র মুকুটমণিপুর। জল, জঙ্গল ও পাহাড়ের সমারোহে শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। কংসাবতী ও কুমারী নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত মুকুটমণিপুর পর্যটন মানচিত্রে অনেকদিন ধরেই পরিচিত নাম। এই এলাকার পর্যটনে উন্নতির জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে রাজ্য সরকার। হুল দিবসের অনুষ্ঠানে মুকুটমণিপুরে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছেন। পর্যটন দপ্তরের মাধ্যমে একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
কী কী হবে মুকুটমণিপুরে?
১. রোপওয়ে: পরেশনাথ মন্দির থেকে ড্যামের ওপারে গোপালপুর পর্যন্ত। ইতিমধ্যেই RITES-এর তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল সমীক্ষা করেছে।
২. মিনি জ়ু: বন পুকুরিয়া ডিয়ার পার্ক সংস্কার করে সেখানে তৈরি হবে।
৩. উন্নত পার্ক
৪. পরেশনাথ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার
৫. পর্যটকদের জন্য আবাসন
৬. তিনটি ভিউ পয়েন্ট
৭. বারঘুটুর সংস্কার-সহ রাস্তা ঘাট শৌচালয়, পানীয় জল, নিরাপত্তা-সহ একাধিক উন্নয়নের কাজ
স্থানীয় বিধায়ক ও মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু জানান, পর্যটকদের কাছে মুকুটমণিপুরকে আর্কষণীয় করে তুলতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশ অনুযায়ী পর্যটন দপ্তর কাজ শুরু করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টাও হচ্ছে। জমিজটে আটকে থাকা ছাতনা-মুকুটমণিপুর রেলপথের কাজ আগামী এক বছরের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করে শুরু হয়ে যাবে।
মুকুটমণিপুর হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুদীপ সাহু-র কথায়, ‘নতুনত্ব কিছু না থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে মুকুটমণিপুরে পর্যটক কমে আসছিল।’ তাঁদের আশা, মুকুটমণিপুরে পর্যটন বাড়লে স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়বে। দক্ষিণ বাঁকুড়ার একটা বৃহৎ অংশের আর্থিক করিডর খুলে যাবে।
মুকুটমণিপুর পর্যটন কেন্দ্রে নৌকা চালান তারাপদ সিং সর্দার। তিনি বলেন, ‘নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে শীত পড়লেই পর্যটকরা আসেন। সরস্বতী পুজো পর্যন্ত চলে মরশুম। বাকি সময়ে তাঁরা জলাধারে মাছ ধরেন।’ ওই এলাকার পর্যটন কেন্দ্রে হস্তশিল্পের পসরা নিয়ে বসেন জগবন্ধু সাহু। তাঁর কথায়, ‘এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন ব্যবসা করেন। অফ সিজ়নে ৮-১০টি দোকান খোলা থাকে। শনি-রবিবার পর্যটক এলে কেনাবেচা হয়, বাকি সময় ফাঁকা থাকে।’ মুকুটমণিপুরে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়লে, সবারই আয় বাড়তে পারে বলে আশা তাঁর। রোপওয়ে ও মিনি জ়ু হলে বছরভর পর্যটকের ঢল নামবে বলে আশা স্থানীয় ব্যবসায়ী উত্তম কুম্ভকারের।
মুকুটমণিপুরে গেলে কোথায় থাকবেন: