• নেপালে হড়পা বানের তাণ্ডব, নিখোঁজ বাংলার একাধিক পর্যটক, নবান্নে কন্ট্রোল রুম
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ২৭ আগস্ট ২০২৬
  • নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানের পর ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে বিপর্যয়ের ব্যাপকতা (Nepal Flash Flood)। পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে আচমকা নেমে আসা কাদা, পাথর ও জলের প্রবল স্রোতে বিপর্যস্ত বিস্তীর্ণ এলাকা। বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভেঙে গিয়েছে রাস্তা ও সেতু, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই পরিস্থিতিতে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা কিংবা নেপাল ভ্রমণে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে রাজ্য জুড়ে (Nepal Flash Flood)।

    রাজ্যের ৩২ জন পর্যটক এখনও নিখোঁজ বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, ওই পর্যটকদের অধিকাংশই কলকাতা ও চন্দননগরের বাসিন্দা। একটি নির্দিষ্ট পর্যটন সংস্থার মাধ্যমেই তাঁরা নেপালে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে।

    মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari) জানান, নিখোঁজদের সন্ধানে রাজ্য সরকার খোঁজখবর নিচ্ছে। বুধবার রাত থেকেই নবান্নে একটি কন্ট্রোল রুম (Nabanna Control Room) খোলা হয়েছে। সেখান থেকে নিয়মিত ভাবে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। নেপাল সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি (Nepal Flash Flood)।

    মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari) আরও জানান, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে সাত-আট জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা হয়েছে। রাজ্য সরকার ওই পর্যটকদের সন্ধান এবং তাঁদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য সব রকম সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

    কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর থেকে খড়্গপুর, তারকেশ্বর, ডায়মন্ড হারবার, বারুইপুর ও বসিরহাট— বাংলার নানা প্রান্তে এখন একই উদ্বেগ। বাড়ি থেকে বেড়াতে বা তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের শেষ ফোনালাপটুকুই এখন আঁকড়ে রয়েছেন পরিবারের সদস্যেরা। কোথাও বন্ধ বাড়ির দরজার সামনে অপেক্ষা, কোথাও আবার বার বার ফোন করেও মিলছে না কোনও উত্তর।

    কলকাতার সার্ভে পার্ক থানা এলাকার বাসিন্দা মানসকুমার ঘোষ এবং তাঁর স্ত্রী দীপালি সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বলে পরিবারের দাবি। গত ২১ আগস্ট তাঁরা নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন বলে প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁদের মেয়ে অদ্রিজা ঘোষ বর্তমানে দিল্লির এইমসে পড়াশোনা করেন। তাঁর দাবি, বিপর্যয়ের আগে পর্যন্ত মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।

    শেষ বার কথা বলার সময় সব কিছু স্বাভাবিক ছিল বলেই তাঁরা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার পর থেকেই আর কোনও খোঁজ নেই। পরিবারের অভিযোগ, যে সংস্থার সঙ্গে তাঁরা নেপালে গিয়েছিলেন, সেই সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নেপালে গিয়ে নিখোঁজ কলকাতার পাটুলির বাসিন্দা বছর ৬১-এর অমরনাথ পাল। জানা গিয়েছে, চলো যাই ট্যুর অ্যান্ড ট্র্যাভেলসের সঙ্গে তিনি নেপালে গিয়েছিলেন

    নিখোঁজ পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের বাসিন্দা, ৬২ বছরের স্বপনকুমার সিংহও। অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী স্বপন দিন কয়েক আগে একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন। পরিবারের দাবি, বুধবারের পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নেপালের বিপর্যয়ের খবর সামনে আসতেই উদ্বেগ বেড়েছে পরিজনদের।

    তারকেশ্বরের বাসিন্দা স্নেহাশিস দত্তও ছিলেন গত ২১ অগস্ট কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশে রওনা দেওয়া একটি দলের সদস্য। একটি ট্যুর এজেন্সির মাধ্যমে ৩২ জনের ওই দলটি যাত্রা শুরু করেছিল। দলের সঙ্গে ট্যুর ম্যানেজার হিসেবে ছিলেন জয়ন্ত সান্যাল। পরিবারের দাবি, বুধবার সকালে শেষ বার স্নেহাশীষের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁদের। তার পর থেকেই তাঁর ফোনে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

    শিলিগুড়ির শান্তিনগরের বউবাজার এলাকার বাসিন্দা সমর মণ্ডলের খোঁজও মিলছে না। গত ১৬ আগস্ট কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার ভোর প্রায় পাঁচটা নাগাদ শেষ বার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল সমরের। সে সময় তিনি নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি ইমিগ্রেশন অফিসে রয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন। সেই ফোনালাপের পর থেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কয়েক দিন ধরে কোনও খবর না মেলায় সমরের সন্ধানে পরিবারের কয়েক জন সদস্য ইতিমধ্যেই নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।

    উদ্বেগ ছড়িয়েছে দুর্গাপুরেও। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া শহরের পাঁচ বাসিন্দার সঙ্গেও হড়পা বানের পর থেকে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে দাবি পরিবারের। গত ২১ অগস্ট কলকাতার একটি দলের সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁরা। ওই পাঁচ জনের মধ্যে রয়েছেন সিটি সেন্টারের বাসিন্দা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়া রয়েছেন শ্রীনগরপল্লির সুভাষচন্দ্র ঘোষ এবং বামুনাড়ার বাসিন্দা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় ও মৌসুমী গঙ্গোপাধ্যায়।

    মৌসুমীকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে একটি সূত্রে খবর মিললেও, সেই তথ্য নিয়ে সরকারি নিশ্চিতকরণের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁর পরিজনেরা। অন্যদের খোঁজ না মেলায় উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবার ও প্রতিবেশীদের।

    নেপালে হড়পা বানের ভয়াবহ  (Nepal Flash Flood) বিপর্যয়ের জেরে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া দুর্গাপুরের পাঁচ বাসিন্দাকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বুধবার থেকে তাঁদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। পরিজন ও প্রতিবেশীদের দাবি, ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এখনও পর্যন্ত কোনও খবর মেলেনি।

    গত ২১ আগস্ট কলকাতার একটি দলের সঙ্গে কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন ওই পাঁচ জন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সিটি সেন্টারের বাসিন্দা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়া শ্রীনগরপল্লির সুভাষচন্দ্র ঘোষ এবং বামুনাড়ার বাসিন্দা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় ও মৌসুমী গঙ্গোপাধ্যায়ও ওই যাত্রায় সামিল ছিলেন।

    বৃহস্পতিবার অবশ্য মৌসুমী গঙ্গোপাধ্যায়কে উদ্ধার করা হয়েছে বলে একটি সূত্রে খবর মেলে। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত সেই খবরের কোনও সরকারি নিশ্চিতকরণ না মেলায় তাঁর দুর্গাপুরের প্রতিবেশীদের উদ্বেগ কাটেনি। পুলিশ বা প্রশাসনের তরফেও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য তাঁরা পাননি বলে জানিয়েছেন।

    ডায়মন্ড হারবারের সরিষার বাসিন্দা, পেশায় স্কুলশিক্ষিকা কেয়া প্রামাণিকও নেপালে গিয়ে (Nepal Flash Flood) নিখোঁজ বলে পরিবারের দাবি। গত ২১ অগস্ট একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। বিপর্যয়ের আগে পরিবারের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথাও হয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি পরিজনেরা।

    নেপালের এই বিপর্যয়ে  (Nepal Flash Flood) নিখোঁজ বারুইপুরের এক দম্পতিও। বারুইপুরের বাসিন্দা ৬৬ বছরের নিখিলরঞ্জন বিশ্বাস এবং তাঁর স্ত্রী, ৬০ বছরের শিখা নস্কর গত ২১ অগস্ট কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৪ অগস্ট শেষ বার ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তাঁদের। তার পর থেকেই আর স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

    কর্মসূত্রে তাঁদের ছেলে বাইরে থাকেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর থেকে উদ্বেগে রয়েছেন তিনি এবং পরিবারের অন্য সদস্যেরা। এ দিকে, নিখিলরঞ্জন ও শিখার খোঁজ না মেলায় ফাঁকাই পড়ে রয়েছে বারুইপুরের বাড়িটি। কবে ফিরবেন তাঁরা, সেই অপেক্ষাতেই রয়েছেন পরিজনেরা।

    হড়পা বানের পরিস্থিতির মধ্যেই নিখোঁজ বসিরহাটের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা স্বপন মণ্ডল এবং তাঁর স্ত্রী মৌ মণ্ডল। সপ্তাহখানেক আগে কৈলাস ভ্রমণের উদ্দেশে তাঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন (Nepal Flash Flood)। নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন পরিবারের সদস্যেরা ও পরিচিতেরা। কিন্তু দু’জনেরই ফোন বন্ধ থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

    স্বপন বসিরহাট টাউন হাই স্কুলের এবং মৌ বসিরহাট বরোদা প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা। তাঁদের একমাত্র সন্তান বিদেশে থাকেন। মা-বাবার কোনও খবর না পাওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন তিনিও। দম্পতির খোঁজ না মেলায় চিন্তায় পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

    নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সময় পাহাড়ি অঞ্চলে আচমকা বিশাল জলরাশি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত উপত্যকা দিয়ে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা। রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রাপথে থাকা পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের খোঁজ নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।

    একই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাওয়া এত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উৎকণ্ঠা ছড়িয়েছে রাজ্য জুড়ে। কোথাও শেষ ফোনালাপের স্মৃতি, কোথাও বন্ধ ফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা। কোথাও আবার ফাঁকা বাড়ির দিকে তাকিয়ে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা।

    এ দিকে নবান্নের কন্ট্রোল রুম (Nabanna Control Room) থেকে নিখোঁজদের সন্ধানে নিয়মিত যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari) জানিয়েছেন। নেপাল সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে রাজ্য প্রশাসন। পরিবারগুলির এখন একটাই অপেক্ষা— দ্রুত মিলুক প্রিয়জনদের খোঁজ। হড়পা বানের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ফিরুক নিরাপদে বাংলার পর্যটকেরা।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)