নেপালের হড়পা বান এক মুহূর্তে বদলে দিয়েছে চেনা ছবিটা। যে পাহাড়ি পথে ছুটত জীবন, যে নদীর দু’পাশে গড়ে উঠেছিল ঘরবাড়ি, হড়পা বানের ভয়াল স্রোতে আজ সেখানেই শুধুই ধ্বংসের ছবি। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান-সহ একাধিক জেলা বিপর্যস্ত। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু— কিছুই রেহাই পায়নি, পাথর আর জলের তাণ্ডব থেকে। প্রিয়জনকে হারানোর আতঙ্কে রাত কাটছে হাজার হাজার মানুষের। নেপালের এই প্রলয় ফের ফিরিয়ে আনল ২০১৫-র সেই ভয়াল স্মৃতি, যে ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকোয়নি।
যেখানে ছিল সবুজে ঘেরা বসতি, রাস্তার ধারে ছোট ছোট দোকান আর মানুষের চেনা জীবন, সেখানে এখন শুধুই কাদা আর পলিমাটি। বিশাল অংশের জমি ও নদীর পাড় ধসে গিয়ে তলিয়ে গিয়েছে জলের নীচে। দেবীঘাট, বেত্রাবতী, হাকুবেসি এবং সিয়াফরুবেসির মতো এলাকার সঙ্গে যোগাযোগও কার্যত বিচ্ছিন্ন। বহু পরিবার ঘর হারিয়েছে। অনেকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। নিজের শিকড়ের এই ছবি দেখে স্থির থাকতে পারেননি ভারতের প্রাক্তন ফুটবলার শ্যাম থাপা।
বৃহস্পতিবার বিকেলে এই সময় অনলাইন যোগাযাগ করেছিল তাঁর সঙ্গে। ফোনে কথা বলার সময়ে গলা ভারী হয়ে আসছিল শ্যাম থাপার। ধরা গলায় তিনি বলেন, ‘এই ছবিগুলো আর চোখে দেখতে পারছি না। ওই জায়গাগুলোর সঙ্গে আমার কত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, কত বার গিয়েছি। পাহাড়ের বুক চিরে নদী বয়ে চলেছে, রাস্তার দু’পাশের সেই অসাধারণ সৌন্দর্য— সব যেন চোখের সামনে শেষ হয়ে গেল।’
খানিক থেমে তিনি বলেন, ‘ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ে ছোট ছোট কত দোকান দেখতাম। কোথাও বসে খেয়েছি, কোথাও আড্ডা দিয়েছি। সেই জায়গাগুলোই আজ কাদা আর জলের নীচে। মনে হচ্ছে, শুধু একটা জনপদ নয়, আমার নিজের চেনা একটা পৃথিবী যেন হারিয়ে গেল।’
শ্যাম থাপার কথায় বারবার ফিরে আসে সেই অসহায় মানুষগুলোর ছবি। তিনি বলেন, ‘ভিডিয়োতে মানুষকে যে ভাবে প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটতে দেখছি, সেটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটা মানুষের ঘর, সংসার, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবন— সব কিছু জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখলে চোখের সামনে শুধু ধ্বংসটাই ভেসে ওঠে।’
শ্যাম থামা বলছিলেন, ‘প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়, এই বিপর্যয় আবার সেটা দেখিয়ে দিল। যে জায়গাগুলোতে গিয়েছি, যেখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, সেই চেনা ছবিগুলো এখন আর নেই। সব কিছু যেন এক নিমেষে বদলে গেল।’
শ্যাম থাপা অবশ্য জানান, নেপালে থাকা তাঁর আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবরা নিরাপদেই রয়েছেন। পরিচিতদের নিরাপদ থাকার খবর কিছুটা স্বস্তি দিলেও নেপালের এই বিপর্যয় তাঁর মন থেকে ভয় আর যন্ত্রণা মুছে দিতে পারেনি। কারণ এই দেশ তাঁর কাছে শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, তাঁর শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের নাম। জড়ানো গলায় শ্যাম থাপা তাই বলেন, ‘আমার পরিচিতরা সকলে ঠিক আছেন। কিন্তু যাঁদের হারালাম, তাঁদের সঙ্গেও তো আমার শিকড়ের যোগ।’