• দার্জিলিং-সিকিমও কি বিপদের মুখে? নেপালের ঘটনায় আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
    এই সময় | ২৮ আগস্ট ২০২৬
  • হড়পা বানে ধ্বংস নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা। পাহাড়ি এলাকায় এমন ধ্বংসলীলা নতুন নয়। নেপাল শুধু নয়, উত্তরকাশী ও জোশীমঠের মতো ভারতের হিমালয় পার্বত্য এলাকাতেও হড়পা বানের ভয়ঙ্কর স্মৃতি এখনও তাজা। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং এবং লাগোয়া সিকিম হিমালয় পার্বত্য এলাকা। একদিকে পার্বত্য ভূপ্রকৃতি, নদী-হ্রদ রয়েছে, তার সঙ্গে বেড়ে চলেছে পরিকাঠামো। বাস্তুতন্ত্রের দিক থেকে স্পর্শকাতর এই এলাকাও। কেন বিপদ আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা?

    বাঙালিদের ঘরের কাছের পাহাড় বলতে দার্জিলিং এবং সিকিম। বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক ভিড় জমান এই দুই জায়গায়। বেলাগাম ভাবে এখানে বেড়ে চলেছে নির্মাণ, রয়েছে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ। পাহাড় কেটে তৈরি হচ্ছে রাস্তা। নেপালে যেমন ঘটনার সাক্ষী হলো গোটা বিশ্ব, দার্জিলিং-সিকিম নিয়ে সেই ভয় পাওয়া কি একেবারেই অমূলক?

    নেপালের প্রসঙ্গ উঠতেই জোশীমঠের পাহাড়ি বন্যার ঘটনা স্মরণ করালেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ডিজ়াস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের (CDPM) কোঅর্ডিনেটর গুপিনাথ ভাণ্ডারী। তিনি বলেন, ‘দার্জিলিংয়ের অবস্থা যে কোনও মুহূর্তে জোশীমঠের মতো হলে অবাক হব না। এখনও যে হচ্ছে না, সেটা খুশির খবর।’ বেলাগাম বহুতল হোটেল ও অন্য নির্মাণ বাড়িয়ে যাওয়া ক্রমশ বিপদ ডাকছে বলে তাঁর মত। পাহাড়ি এলাকা বড় বড় বাড়ির ওজন নেওয়ার মতো নয়। তার ফলে ধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তার সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি হলে ধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়।’ দার্জিলিংয়ের ক্ষেত্রে বৃষ্টির সেই সীমা কতটা, সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না।

    অল্প বৃষ্টি অনেকক্ষণ ধরে হলে, ভূমিতে পড়ে সেটা মাটির ভিতর চুঁইয়ে যাওয়ার সময় বেশি পায়। তারপরে মাটির উপর দিয়ে জমির ঢাল বেয়ে (water surface runoff) গড়িয়ে যায়। অল্প সময়ে অনেক বিষয়ে হলে অধিকাংশ জল এ ভাবে গড়িয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে অল্প করে বৃষ্টি (Low Intensity) হলে মাটির ভিতর জল বেশি যায়। সেটা হলে, মাটির ভিতরে জল ঢোকার পরে বাইরে শুকিয়ে গেলে, ভিতর থেকে চাপ তৈরি করে সেই জল। সেটা ভূমিধসের আশঙ্কা অনেক বাড়িয়ে দেয় বলে জানাচ্ছেন অধ্যাপক গুপিনাথ ভাণ্ডারী। নেপালের এই ঘটনার পরে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

    বিষয়টি বোঝানোর জন্য নেপালের ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োর প্রসঙ্গ টেনেছেন অধ্যাপক গুপিনাথ ভাণ্ডারী। তিনি জানান, ঢাল যদি বেশি হয় তাহলে জলের স্রোতের গতিবেগও বেশি হয়। বিজ্ঞানের নিয়মেই সেই জলস্রোতের এনার্জি বা শক্তিও অনেক বেশি হয়। তার ফলে তার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাও অনেক বেশি। সমতলের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আলাদা। তাঁর মতে, সমতল এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে তখন বন্যা হলেও এমন হড়পা বান কিংবা কাদামাটি ও বোল্ডারের স্রোতের ছবি তেমন দেখা যায় না ভূ-প্রাকৃতিক নিয়মেই।

    দার্জিলিং ও সিকিমের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ঝরে পড়েছে অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের সহকারী অধ্যাপক ড. সৌমিতা ব্যানার্জীর কথায়। তিনি বলছেন, ‘সিকিমে এমন ঘটনা তো ঘটেছে। ওই রাজ্যে চারশোরও বেশি হ্রদ রয়েছে।’ আরেকটি বিষয় আলোচনায় এনেছেন তিনি। সৌমিতা জানাচ্ছেন, সিকিমে ভূমির ঢালের পার্থক্য অনেক বেশি। এমন ভূপ্রকৃতি হলে ঢাল বেয়ে মারাত্মক গতিতে জল নামতে পারে। এছাড়াও সিকিমে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ, পরিকাঠামো রয়েছে। সব মিলিয়ে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে তার ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা। দার্জিলিং নিয়ে তাঁর মত, ‘এই জায়গাটি ক্যাসকেডিং জ়োনে রয়েছে। অর্থাৎ সিকিম থেকে তিস্তা হয়ে ধাক্কা আসতে পারে।’ তিস্তার পলি বয়ে নিয়ে আসাটাও মাথায় রাখা উচিত বলে তিনি জানাচ্ছেন। সেবকের করোনেশন ব্রিজ পেরোনোর পরে তিস্তা কেমন ঘোলাটে থাকে, সেই উদাহরণও দিয়েছেন তিনি। বাস্তুতান্ত্রিক দিক থেকে স্পর্শকাতর এলাকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধের মতো নির্মাণ বিপদ বাড়ায় বলেই মত তাঁর।

    বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, জলবায়ু বদলের মতো ঘটনা এমন ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ড. সৌমিতা ব্যানার্জী বলেন, ‘নেপালে এর আগেও গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) হয়েছে। সাধারণত বলা হয়, GLOF-এর ৯০ মিনিট আগে পূর্বাভাস পাওয়া যায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সময়টাও এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।’ তার সঙ্গে নেপালে এখন সে ভাবে রিয়েল টাইম GLOF মনিটারিং সিস্টেম নেই বলে তাঁর মত।

    অধ্যাপক গুপিনাথ ভাণ্ডারীর মন্তব্য, ‘আমাদের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট হয়। একটা লোক বিপদে পড়লে তাঁকে উদ্ধার করা যায়। কিন্তু সব লোক বিপদে পড়লে, তাঁদের উদ্ধার করলেও কোথায় রাখবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘ভূপ্রকৃতি কেমন রয়েছে তার উপর নির্ভর করে বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি কেমন হবে। পাহাড়ি এলাকায় যেমন প্রস্তুতি প্রয়োজন, সমতল পললভূমিতে তার তুলনায় অন্যরকম প্রস্তুতি প্রয়োজন।’

    বিপর্যয় মোকাবিলা গবেষকেরা জানাচ্ছেন, হিমালয় ঘিরে মানুষের যে জীবনযাত্রা তার মধ্যে ২টি দিক রয়েছে-- একটি বাস্তুতন্ত্রের দিক, অন্যটি সামাজিক-অর্থনৈতিক দিক। এই দু’টির মধ্যে অনবরত মিথস্ক্রিয়া চলে এবং বহুমাত্রিক-জটিল সম্পর্ক রয়েছে। এই ২টির একটিতেও যখন কোনও আঘাত আসে, তখন সেটা সামগ্রিক ভাবে প্রভাব ফেলে।

    প্রকৃতিকে বশ করার জন্য যখনই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ এবং আরও নানা ভারী নির্মাণ তৈরি হয়, সেটাই পরে বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। সেই কারণে এমন দুর্যোগকে নেহাত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে না দেখে, বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার ফল হিসেবে দেখার দাবি গবেষকদের একাংশের।

    হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর পর্বতের ক্ষেত্রে নানা দেশেই উন্নয়নের জন্য যে যে কাজ করা হচ্ছে, তাতে প্রাথমিক ভাবে লাভ পাওয়া গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে বড়সড় বিপদ নিয়ে আসে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। পাহাড় কেটে রাস্তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি কিংবা ব্যাপক নির্মাণের ফলে নড়বড়ে হয়ে যায় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য। এই সমস্যা এড়াতে পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির ভারসাম্য বুঝে উন্নয়ন একমাত্র রাস্তা বলে মত বিশেষজ্ঞদের। আর সেই রকম উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে এমন বিপদ এড়ানো যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

  • Link to this news (এই সময়)