চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজে লাগেনি জ্যোতি বসুর দেহ! প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যুর ষোলো বছর পর সে বিষয়ে অকপট স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার শঙ্কর নেত্রালয়ের চক্ষুদান সংক্রান্ত সচেতনতামূলক এক অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “অনেক শ্রদ্ধার সঙ্গে বলছি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু যে দেহটা দান করেছিলেন, মেডিক্যাল সায়েন্সের কোনও কাজে আসেনি তা। কাজে আসত যদি তিনি লাইভডোনেশন করতেন।” পাশাপাশি তাঁর আর্জি, ‘কেউ দেহ দান করবেন না।’ এতেই মাথাচাড়া দিয়েছে প্রশ্ন।
কী এই লাইভডোনেশন? মুর্মুর্ষু ব্যক্তির মস্তিষ্কের কোষে যখন অক্সিজেন পৌঁছয় না, তখন তা কাজ করা বন্ধ রাখে। ভেন্টিলেটর সাপোর্টের মাধ্যমে রোগীর হার্ট শুধু সচল থাকে। চিকিৎসক এই সময় ব্রেন ডেথ ঘোষণা করেন। এই অবস্থায় রোগীর দেহ থেকে কিডনি, লিভার, হার্ট প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু রোগীর শ্বাস এবং রক্ত চলাচল, দুইই যখন বন্ধ হয়, তখন তা ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’। তখন আর অঙ্গ প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। সে সময় দেহ দান করা হয়। যা মূলত কাজে লাগে মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগে। ডাক্তারি পড়ুয়ারা মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ গঠন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশোনা করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যদি জ্যোতি বসু ব্রেন ডেথ থাকাকালীন দেহ দান করতেন তবে তা কাজে লাগত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুনে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। সৃজনের বক্তব্য, “শুনেছি শারদ্বতবাবু চিকিৎসক। টেকনিক্যাল বিষয়ে চিকিৎসকরা যা বলবেন তারপর আমার মতো সাধারণ মানুষের বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। ওঁর কথার উত্তর দেবেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা।” সৃজনের সংযোজন, “চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বার্থে দেহদানের নেপথ্যে যে দার্শনিক মন লাগে, তা ছিল নবতিপর জ্যোতি বসুর। তাঁর ওই সিদ্ধান্ত সমাজের অসংখ্য মানুষকে দেহদানের জন্য উৎসাহিত করেছিল।”
যদিও এই গোটা দেহদানকে অপ্রয়োজনীয় বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “অনেকে বলেন, আমি গোটা বডিটা দান করে দিলাম। গোটা বডিটা দান করে কোনও লাভ নেই। অঙ্গদান করুন। মৃতদেহ নিয়ে এখন আর শব ব্যবচ্ছেদ-এর দরকার নেই। তাই দয়া করে দেহ দান করবেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এমন থ্রি ডি ইমেজ তৈরি হচ্ছে, সেখান থেকেই শেখা যাচ্ছে। ইউরোপে আমেরিকায় ইতিমধ্যেই লাইভ বডি ডিসেকশন বন্ধ হয়ে গিয়েছে।” কিন্তু এর জন্য কতটা তৈরি বাংলা? নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুদেষ্ণা মজুমদারের কথায়, এখনও প্রচুর মেডিক্যাল কলেজে মৃতদেহ সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নেই। নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে হবে। যাদের হাতে মৃতদেহ নেই তারা নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ, এসএসকেএম, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের উপর নির্ভরশীল। অংসখ্য বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হচ্ছে বাংলাজুড়ে। সেখানে পরিকাঠামো স্বল্প। সম্প্রতি নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ থেকে দেহ চেয়েছে কৃষ্ণনগর মেডিক্যাল কলেজ, সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ, দুর্গাপুরের একটি মেডিক্যাল কলেজ মৃতদেহ চেয়েছে পড়াশোনা করানোর জন্য। ফলে একাধিক মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের চিকিৎসকরা মনে করছেন, দেহদানের প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি।