বাণিজ্যিক ভাবে তেল উত্তোলন শুরু হলো উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে। মাটির প্রায় ২৩৯৬ মিটার গভীর থেকে তোলা হচ্ছে অপরিশোধিত খনিজ তেল। তা বিশেষ ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে সংশোধনাগারে। আপাতত লক্ষ্য, প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার লিটার তেল উত্তোলন, যা রাজ্যের শিল্প মানচিত্রকেই বদলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রায় এক দশক আগে অশোকনগর এলাকায় সন্ধান চালিয়ে মাটির নীচে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছিল ওএনজিসি। ২০২০ সালে পরীক্ষামূলক উত্তোলনে ওই কূপ থেকে প্রায় ৩৭৫ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়। তার পর থেকেই ওই প্রকল্পের বাস্তবায়নে কেন্দ্রের কাছে তদ্বির করে এসেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। শুক্রবার আনুষ্ঠানিক ভাবে বাণিজ্যিক তেল উত্তোলনের সূচনা করেন ওএনজিসি-র ডিরেক্টর (এক্সপ্লোরেশন) ওপি সিনহা এবং অশোকনগরের বিধায়ক সুময় হীরা। ওএনজিসি-র তরফে জানানো হয়েছে, অশোকনগর কেন্দ্রে এখন মোট ৬টি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি খনিজ তেলের জন্য। বাকি দু’টি প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য।
ওএনজিসি সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৮ সালে যে কূপ থেকে প্রথম বার তেলের সন্ধান মিলেছিল, সেখান থেকে উত্তর-পূর্বে প্রায় ৯৫ মিটার দূরে একটি নতুন কূপ খনন করা হয়। পাম্পজ্যাক ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিভিন্ন শিফটে তেল উত্তোলনের কাজ চলবে। পরবর্তী কালে আরও কয়েকটি কূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে খবর ওএনজিসি সূত্রে।
শুধু তেল উত্তোলন নয়, এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাইগাছি ওএনজিসি কেন্দ্রে যাওয়ার কাঁচা রাস্তা পাকা করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পাশাপাশি অশোকনগরের স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছে ওএনজিসি। স্থানীয় যুবকদেরও বিভিন্ন ভাবে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বাইগাছির পাশাপাশি অশোকনগরের ভুরকুণ্ডা, দৌলতপুর-সহ একাধিক এলাকায় অনুসন্ধান ও খননকাজ চালাচ্ছে ওএনজিসি। তারা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ওই এলাকাগুলি থেকেও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে। গোটা প্রকল্পে ইতিমধ্যেই প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইগাছির অপরিশোধিত তেলের এপিআই গ্র্যাভিটি (জলের তুলনায় কতটা ভারী বা কতটা হালকা, তার পরিমাপ) ৪০-৪১, যা গুণমানের বিচারে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উত্তোলন কেন্দ্র বম্বে হাইয়ের তেলের সঙ্গে তুলনীয়। ও পি সিনহা বলেন, ‘বছর তিনেক আগে তেল উত্তোলনে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তেল শেষ হয়ে গিয়েছিল, এমনটা নয়। তার পরে গত কয়েক বছরে আরও কয়েকটা তেলের খনির খোঁজ মেলে। ৫-৬ দিনের কর্মসূচি নিয়ে এসেছি। প্রতিটা কেন্দ্রই খতিয়ে দেখব। আজ এই কেন্দ্র থেকে যে তেল উত্তোলন করা হচ্ছে, তা খুব ভালো মানের। আগের চেয়ে অনেক ভালো তেল পাওয়া যাচ্ছে। সেই কারণে আলাদা আলাদা জায়গায় আরও কয়েকটি বোরিং করা হচ্ছে। আগামী দিনে আরও বেশি কী ভাবে তেল-গ্যাস উত্তোলন করা যায়, তার প্রয়াস চলবে।’
ওনজিসি কর্তার সংযোজন, ‘এখন যে তেল-গ্যাস আমাদের বাইরের দেশ থেকে আনতে হচ্ছে, আগামী দিনে তা আমাদের দেশেই পাওয়া যেতে পারে। এখান থেকে যে কাঁচা তেল উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই তেলে জল থাকবে। এই জল থেকে তেল আলাদা করে রিফাইন করে পরবর্তী পর্যায়ে অন্যত্র পাঠানো হবে। এখানে পেট্রল-ডিজেল-সহ নানা তেল পাওয়া যাবে। বর্তমানে এখানে ৫-৬টি আলাদা আলাদা জায়গায় বোরিং হবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা জমির। সে ক্ষেত্রে বর্তমান রাজ্য সরকার অনেকটাই সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি এই সব এলাকায় ভারী যানবাহন চলাচল করবে। তাই নতুন রাস্তাঘাটও তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।’
বিধায়ক সুময়ও বলেন, ‘যান্ত্রিক কারণেই এত দিন বন্ধ ছিলো গোটা প্রক্রিয়া। সেই টেকনিক্যাল সমস্যার সমাধান হয়েছে। তাই আজ থেকে যাত্রা শুরু হল। আরও চারটে বোর হবে। এখন একটা বোরে কাজ চলছে। আপাতত বাইগাছি থেকে কাজ চলবে। বাকি যে সব জায়গায় জমিজটের কারণে কাজ বন্ধ, সেখানেও জমিজট প্রায় মিটে গিয়েছে। সেই সব কেন্দ্রেও আগামী দিনে কাজ শুরু হবে। আপাতত বাইগাছিই থেকে কাজ চলবে।’