বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পরে তাঁর দল আড়াআড়ি ভেঙেছে। কিন্তু শীঘ্রই পরিস্থিতির বদল ঘটবে এবং শীঘ্রই তাঁরা ক্ষমতায় ফিরবেন বলে শুক্রবার কলকাতায় দাবি করলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্যাথিড্রাল রোডে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের ছাত্র সমাবেশের মঞ্চ থেকে মমতা বলেন, ‘শীঘ্রই তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে, অপেক্ষা করুন। কী কী হয়, দেখতে থাকুন।’ দিল্লিতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের মতোই বাংলায় বিজেপির পরিণতি হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মমতা। অন্য দিকে, তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা, ‘আগামী দিনে কোনও গদ্দারকেই দলে ফেরত নেওয়া হবে না।’
শুক্রবার তৃণমূল ছাত্রপরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভায় মমতার বক্তৃতায় প্রায় গোড়া থেকে নিশানায় ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কখনও পুলিশ প্রশাসন নিয়ে তাঁকে বিঁধেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, কখনও আবার তাঁর বিভিন্ন মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন। মমতার দাবি, তাঁর আমলে পুলিশ মানবিক ছিল। কিন্তু পালাবদলের পরে রাজ্যের পুলিশ 'দানবিক' হয়ে উঠেছে। ঘটনাচক্রে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু রাজ্যের পুলিশমন্ত্রীও। মমতা বলেন, ‘আমাদের আমলে পুলিশ মানবিক ছিল। বিভিন্ন পরিস্থিতি সামলাতে দিয়ে পুলিশকে মারও খেতে হয়েছে। কিন্তু পুলিশ সংযম বজায় রেখেছে। মানুষকে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখন পুলিশ বুলডোজ়ার চালাচ্ছে! কিন্তু এখন পুলিশকে ভয় দেখাচ্ছে বিজেপি। আমার পাড়ায় তৃণমূল কর্মীদের ধমকাচ্ছে পুলিশ। পুলিশের সন্ত্রাস বন্ধ করবই।’
সম্প্রতি অন্নপূর্ণা যোজনার তিন হাজার টাকা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন জায়গায়। তা নিয়ে শুভেন্দুর সরকারকে বিঁধেছেন মমতা। নাম না করে মুখ্যমন্ত্রীকেও হুঁশিয়ারি, ‘মহিলাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার না দিলে আপনার ভাণ্ডার খুলব।’ অন্নপূর্ণার টাকা না পাওয়ার অভিযোগ ঘিরে বিতর্কে কিছু দিনে ফেসবুক লাইভে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করেছিলেন মমতা। তা নিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আক্রমণও শানান শুভেন্দু। কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘আপনি বিকেলে ফেসবুকেই থাকুন। রাস্তায় নামতে হবে না। আপনি যাতে রাস্তায় নামতে না পারেন, তার ব্যবস্থা করব।’ শুভেন্দুর সেই মন্তব্যের জবাবও শুক্রবার দিয়েছেন মমতা। বলেছেন, ‘আমায় নাকি বেরোতে দেবে না! বুকের পাটা কত বড়! সাহস কত! আর আমি কেন ফেসবুক লাইভ করব, সেটা নিয়েও খুব রাগ।’
তৃণমূলনেত্রী জানান, তিনি শীঘ্রই জেলা সফরে বেরোবেন। পুলিশের অনুমতি না পেলে, হেঁটেই জনসংযোগ করবেন। তাঁর কথায়, ‘জেলা সফর করব। পারমিশন না পেলে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটব। কী ভাবে আটকাবে আটকাও। দেখব কত পুলিশ আছে, কত পাথর আছে।’ প্রসঙ্গত, কয়েক দিন আগে হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে তৃণমূল নেতার মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পরেই সেখানে গিয়েছিলেন মমতা। সেখানে তাঁকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল। অভিযোগ, তাঁর গাড়িতে পাথরও ছোড়া হয়। তার পরেই দলীয় নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘তৃণমূল খুব শিগগির ক্ষমতায় ফিরবে। চমকাতে-ধমকাতে গিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের কী হয়েছে দেখেছেন তো?’ শুভেন্দুকে বিঁধেছেন অভিষেকও। বলেছেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী বলছেন, আমরা ২০৮। বুদ্ধবাবুও বলেছিলেন, আমরা ২৩৫। পরের পাঁচ বছরে ওরা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কত ধানে কত চাল বোঝাব!’
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী প্রাক্তনদের সম্মানও করতে জানেন না বলে অভিযোগ করেছেন মমতা। বলেছেন, ‘আমি এত নীচে নামিনি। আমি বুদ্ধবাবু-জ্যোতিবাবুর নামে কখনও কিছু বলিনি। সম্মান করুন। চুরি করে এসেছেন তো, সম্মান করবেন কী ভাবে! স্বাধীনতা দিবসে হাফ হাতা পাঞ্জাবি পরে গিয়েছেন। ন্যূনতম কার্টসিটুকু জানেন না। গেরুয়া পরার যোগ্যতা আপনার নেই।’
পালাবদলের পর থেকেই রাজ্য জুড়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে গুচ্ছ গুচ্ছ মামলা হয়েছে। তার ভিত্তিতে বহু তৃণমূল নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। পরে তাঁদের কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে গিয়ে এলাকায় ঘোরাতেও দেখা গিয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন সময়ে পুলিশের সামনেই তৃণমূল নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে ডিম হামলার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। সে সব নিয়ে পুলিশ এবং বিজেপিকে নিশানা করেছেন মমতা। বলেছেন, ‘কাদায় ডুবিয়ে মারছেন, নগ্ন করে মারছেন। কোর্টের আদেশ শুধু তৃণমূলের জন্য?’
মমতার আগে বক্তৃতা করতে উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান অভিষেকও। বৃহস্পতিবার ক্যামাক স্ট্রিটে তাঁর অফিসে পুরসভা ও পুলিশের অভিযান নিয়ে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ বলেন, ‘অত্যাচার ততটাই করো, যতটা সহ্য করতে পারবে।’ সভামঞ্চে অভিষেক, কুণাল ঘোষ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ নেতারা ঋতব্রত শিবির এবং দিল্লিতে এনসিপিআই-তে শামিল হওয়া ২০ জন সাংসদকে বেইমান বলে আক্রমণ করেন। অভিষেক বলেছেন, ‘কোনও বেইমানকে আগামী দিনে দলে ফেরত নেওয়া হবে না। নেত্রী যা ঠিক করবেন, সেটাই শিরোধার্য। যারা বিসি গ্রুপে নাম লিখিয়েছেন, তাদের কাউকেই দলে নেওয়া হবে না। আমি বিসি গ্রুপ বলি। বালিশচাটা বলি না।’ মমতাও বলেন, ‘কয়েক দিন দুধভাত খাক। রুই-কাতলা-পাবদা খেয়ে নিক। ওঁদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই কল্যাণেরা লড়ছেন। মানুষের কাছেও ওঁদের জবাব দিতে হবে। আবার একটা পরিবর্তন আসছে।’