সুজয় চট্টোপাধ্যায়
পাট মানেই একটা সময় ছিল বাংলা। বস্তা, দড়ি, চটের ব্যাগ—দৈনন্দিন জীবনে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিল এই ‘সোনালি আঁশ’। সময় বদলেছে। বাজার দখল করেছে প্লাস্টিক। কম দামে, সহজে মেলে বলে প্লাস্টিকের ব্যাগের ব্যবহারও বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে কমেছে পাটজাত সামগ্রীর চাহিদা। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাটের জমিতেও।
অবশ্য পাটের চাষ এখনও আঁকড়ে রয়েছে হুগলির বলাগড়। জেলার মধ্যে এই ব্লকেই সবচেয়ে বেশি চাষ হয়। গোটা রাজ্যে মূলত দুই ধরনের পাট হয়—তিতা ও মিঠা। বলাগড়ের অধিকাংশই মিঠা পাট। ব্লক কৃষি দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে বলাগড়ে প্রায় ৪২৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। ২০২৫-এ এর পরিমাণ ছিল ৪০৫০ হেক্টর। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চাষের পরিমাণ বেড়েছে।
তবে দশ বছর আগে ছবিটা অন্য রকম ছিল। বলাগড়ে প্রায় ৬০০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হতো। এখন তা কমে গিয়েছে অনেকটাই। কৃষকরা এর জন্য মূলত শ্রমিকের অভাব আর চাষের খরচ বৃদ্ধিকেই দায়ী করেছেন।
বলাগড়ের ১৩টি পঞ্চায়েত এলাকাতেই পাট চাষ হয়। তার মধ্যে চলতি বছরে বাকুলিয়ায় ৭২৫ হেক্টর, জিরাটে ৫৮২ হেক্টর, চরকৃষ্ণবাটিতে ৫১৮ হেক্টর, সিজা কামালপুরে ৪৭৭ হেক্টর, তেঁতুলবেড়িয়ায় ৩৮২ হেক্টর, ডুমুরদহ নিত্যানন্দপুর ১-এ ৩৭৪ হেক্টর, শ্রীপুরে ৩৫৭ হেক্টর, ডুমুরদহ নিত্যানন্দপুর ২-এ ১৭০ হেক্টর, গুপ্তিপাড়া ২-এ ৬০ হেক্টর এবং গুপ্তিপাড়া ১-এ ৩৮ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।
এখন পাট কাটার মরশুম। জমি থেকে পাট কেটে আনার পরে শুরু হয় আরও এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। খাল, ডোবা বা জলাশয়ে পাট পচিয়ে তার আঁশ বের করা হয়। আর সেখানেই দেখা দিচ্ছে সমস্যা। চাষিদের অভিযোগ, পাট পচানোর মতো পর্যাপ্ত জল মিলছে না। তার উপর দক্ষ শ্রমিকেরও অভাব। ফলে বাড়ছে খরচ, বাড়ছে চিন্তা।
চরখয়রামারীর পাটচাষি রসময় বৈদ্যের কথায়, ‘এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ।’ তাঁর দাবি, কুইন্টাল প্রতি অন্তত ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা দাম না পেলে লোকসান। পাটের দাম কখনও বাড়ে, কখনও কমে। ফলে কৃষকের পক্ষে নিশ্চিত ভাবে লাভের হিসেব করা কঠিন। তাঁর দাবি, পাটের দাম ১৫ হাজার টাকার নীচে নামলে চাষির পক্ষে টিকে থাকা কঠিন।
কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পাট কিনে নেয় সরকারি সংস্থা JCI। দাম কুইন্টাল প্রতি ৫৯২৫ টাকা। খোলা বাজারে পাটের দাম ঘোরাফেরা করছে ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা প্রতি কুইন্টাল। বাজারের দামের ওঠানামার কারণে কখন পাট বিক্রি করলে কিছুটা ভালো দাম মিলবে, তা নিয়েও সংশয়ে চাষিরা।
পাটচাষিদের অনেকেরই অভিযোগ, তাঁদের পাট মজুত করে রাখার মতো ব্যবস্থা নেই। তাই বাজারে দাম কম থাকলেও প্রয়োজনের তাগিদে স্থানীয় মহাজনদের কাছেই পাট বিক্রি করে দিতে হয়। চাষি অসীম ঘোষালের কথায়, ‘গত কয়েক বছরে প্রথম দিকে পাটের দাম ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে তা কমে ১০-১১ হাজার টাকায় নেমে যায়।’ তাঁর দাবি, চটকলগুলি খুললে পাটের চাহিদা বাড়বে, চাষিরাও ভালো দাম পাবেন।
শুধু পাটের দাম নয়, চাষের খরচ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে চাষিদের। পাটচাষি স্বপন মণ্ডল গোঁসাই জানাচ্ছেন, অন্যান্য বছর পাটের দাম প্রায় ৮ হাজার টাকার আশপাশে থাকলেও এ বছর তুলনায় দাম ভালো। কিন্তু খরচ বেড়েছে। বেড়েছে সারের দামও। ফলে লাভ খুব বেশি হচ্ছে না। নিজের জমি না থাকলে খাজনা দিয়ে জমি নিয়ে চাষ করতে হয়। সেখানেও বাড়তি খরচ। ফলে সার থেকে শ্রমিক—সব দিকেই খরচ বাড়ায় চাষির ঘাড়ে চাপ বাড়ছে।
তবে চাষিদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ প্লাস্টিক নিয়ে। চটের বস্তা বা পাটের জিনিসের চাহিদা এখন আর আগের মতো নেই। চারিদিকে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে গিয়েছে। কম খরচে পাওয়া যায় বলে মানুষও ঝুঁকছেন। যদিও প্লাস্টিক বন্ধ করার নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ হয়নি।
চাষিদের চোখ বন্ধ চটকলগুলির দিকে। তাঁদের যুক্তি, জুটমিল চালু হলে পাটের ব্যবহার বাড়বে। বাড়বে চাহিদা। আর চাহিদা বাড়লে পাটের দামও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে চটকল চালু হলে কর্মসংস্থানও হবে। অসীম ঘোষালের কথায়, ‘সরকার যদি JCI-এর মাধ্যমে পাট সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে, তা হলে চাষিরা আরও উপকৃত হবেন।’
এই পরিস্থিতিতে আশার কথা শোনাচ্ছেন বলাগড়ের বিধায়ক তথা মন্ত্রী সুমনা সরকার। তাঁর দাবি, চাষিদের কথা মাথায় রেখেই সরকার কাজ করছে। সুমনা বলছেন, ‘আগের সরকারের সময়ে পাটের দাম ৬ হাজার টাকা ছিল, ক্ষমতায় আসার পরে তা ৯ হাজার টাকা করা হয়েছে।’ পাশাপাশি বন্ধ জুটমিলগুলিও ফের খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পাট সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েও সরকারের তরফে ভাবনাচিন্তা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, নতুন সরকার এখনও ১০০ দিনও পার করেনি। তবে চাষিদের সমস্যা নিয়ে সরকার অবশ্যই কথা বলবে।
বলাগড়ে পাট শুধু একটি ফসল নয়, বহু পরিবারের জীবিকার অবলম্বন। এখানকার পাটের পরেই শুরু হয় পেঁয়াজ চাষ। ফলে পাটের দাম কমলে তার প্রভাব পড়ে গোটা কৃষি অর্থনীতিতেই। একদিকে শ্রমিকের অভাব, অন্য দিকে সার ও চাষের খরচ বৃদ্ধি, তার উপর প্লাস্টিকের দাপটে পাটজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে সঙ্কটে ‘সোনালি আঁশ’।
তবু হাল ছাড়তে নারাজ বলাগড়ের চাষিরা। তাঁদের আশা, চটকলগুলি ফের পুরোদমে চলবে, পাটের চাহিদা বাড়বে, আর সঠিক দাম মিললে আবারও লাভের মুখ দেখবে পাটের জমি। কারণ তাঁদের কাছে পাট বাঁচা মানেই শুধু একটি ফসল বাঁচা নয়—পাট বাঁচা মানে বহু কৃষক পরিবারের সংসার বাঁচা।