রূপক মজুমদার, বর্ধমান
‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল বিড়াল’— ঠিক এমন পরিস্থিতির সাক্ষী থাকলেন পূর্ব বর্ধমানের ভাতার ব্লকের মানুষ। বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পে (বিইইউপি বা এমএলএল্যাড) মুক্তমঞ্চ ও গ্রিন রুম তৈরি করার বদলে নির্মাণ করা হলো একটি মন্দির।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫-এর মে মাসে। ভাতার ব্লকের এরুয়ার পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান হাসমত শেখ এরুয়ার গ্রামের দত্তপাড়া এলাকায় একটি মুক্তমঞ্চ ও গ্রিন রুম তৈরির জন্য জামালপুরের এক ঠিকাদার সংস্থাকে ওয়ার্ক অর্ডার দেন। প্রজেক্ট মূল্য ধরা হয় সাত লাখ টাকা। সূত্রের খবর, ওয়ার্ক অর্ডারের সঙ্গেই দিয়ে দেওয়া হয় প্রায় ৬০ শতাংশ অগ্রিম টাকা। তৎকালীন বিডিও দেবজিৎ দত্তকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন প্রধান। এর পরেই কাজ শুরু করে ঠিকাদার সংস্থা।
গোল বাঁধল কাজ শেষ হওয়ার পরে। প্রাপ্য বকেয়া টাকার জন্য পঞ্চায়েতে ফাইনাল বিল জমা দেয় ঠিকাদার সংস্থা। ততদিনে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের সূচি ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। কমিশনের নির্দেশে বদলি করা হয় বিডিও দেবজিৎ দত্তকে। তাঁর জায়গায় নতুন বিডিও হয়ে আসেন অনুপ চক্রবর্তী। ভোটে সরকার পরিবর্তনের পরে ভাতার বিধানসভাতেও পরিবর্তন ঘটে। তৃণমূল বিধায়ক মানগোবিন্দ অধিকারীকে হারিয়ে নির্বাচিত হন বিজেপি বিধায়ক সৌমেন কার্ফা।
নতুন সরকার গঠনের পরে বকেয়া টাকার জন্য বার বার পঞ্চায়েতের দ্বারস্থ হতে থাকেন ঠিকাদার। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিল পাঠানো হয় জেলাশাসকের দপ্তরে। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিল সেকশনের সন্দেহ হওয়ায় তারা বিডিও-কে ছবি সমেত নিরপেক্ষ তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলে। এর পরেই বিডিও অনুপ চক্রবর্তী এরুয়ার পঞ্চায়েতের প্রধান হাসমত শেখ, উপ-প্রধান সুখি কিস্কু ও নির্মাণ সহায়কের কাছে রিপোর্ট ও ছবি চেয়ে পাঠান।
ছবি জমা পড়ার পরে দেখা যায়, মুক্তমঞ্চর জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে মন্দির। বিইইউপি প্রকল্পের স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে, বিধায়ক তহবিলের টাকা দিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য স্থায়ী সরকারি সম্পদ যেমন কমিউনিটি হল তৈরি করা যায়, তবে তা কোনও একটি নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা যায় না। যেমন, মন্দির-মসজিদ বিধায়ক তহবিলের টাকায় তৈরি করা যায় না। সেখানে কী ভাবে এই কাজ হলো, তা নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। সূত্রের খবর, সমস্যা সমাধানের জন্য পঞ্চায়েতের প্রধান, ঠিকাদার ও অন্যদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন বিডিও। অভিযোগ, এই বৈঠকে মোটা টাকার লেনদেনও হয়।
এর পরে গত ১৯ অগস্ট জেলাশাসকের দপ্তরে একটি মেমো (নম্বর ১১৭৯এ) পাঠায় বিডিও অফিস। তাতে বিডিও অনুপ চক্রবর্তী, উপ-প্রধান সুখি কিস্কু এবং নির্মাণ সহায়ক— তিন জনেরই স্বাক্ষর ছিল। রিপোর্টে জিপিএস ক্যামেরা ব্যবহার করে তোলা ১৮ অগস্টের একটি ছবি যুক্ত করে দেখানো হয় কাজ সম্পূর্ণ ঠিক হয়েছে।
কিন্তু জেলাশাসকের দপ্তরের সন্দেহ হওয়ায় ২০ অগস্ট জেলা থেকে একটি গোপন তদন্তকারী টিম পাঠানো হয়। তারা সরেজমিনে তদন্ত করে জানতে পারে, মুক্তমঞ্চ ও গ্রিন রুমের জায়গায় তৈরি করা হয়েছে একটি মন্দির। বিডিও যে ছবি পাঠিয়েছিলেন, তা প্রযুক্তির সাহায্যে এডিট করে জাল করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন বিডিও জেলাশাসকের চোখ হিসেবে কাজ করেন। সেখানে এ ভাবে কোনও বিডিও কী ভাবে রিপোর্ট বিকৃত করে জমা দিতে পারলেন, তা ভেবেই আমরা অবাক হচ্ছি।’ এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য বিডিও, প্রধান ও উপ-প্রধানকে একাধিক বার ফোন ও মেসেজ করা হলেও তাঁদের কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
যে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের তহবিলের টাকায় এই প্রকল্প হয়েছিল, সেই মানগোবিন্দ অধিকারী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘হ্যাঁ, ওখানে মুক্তমঞ্চ ও গ্রিন রুমের বদলে মন্দির তৈরি হয়েছে। এখন তো সনাতনি সরকার। এ সব নিয়ে নিশ্চয়ই তারা কিছু করবে না।’ কিন্তু সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রাক্তন বিধায়কের বক্তব্য, ‘সে আর কী করা যাবে, গ্রামের মানুষের চাহিদা ছিল। প্রয়োজনে আমরা ব্যাক ডেটে মাস পিটিশন দিয়ে দেবো।’
অন্য দিকে, ভাতারের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক সৌমেন কার্ফা বলেন, ‘এই বিষয়টি আমার ঠিক জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। কোনও দুর্নীতি হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করব।’