কৌশিক দে, মালদা
কথা বলতে পারেন না। কানে শোনেনও না। এই প্রতিবন্ধকতা তাঁদের রোজগারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং ইশারা, হাসিমুখ এবং একটি মেনুকার্ডকে ভরসা করে মোমোর ব্যবসা চালিয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠেছেন ইংরেজবাজারের কৃষ্ণপল্লির দম্পতি জ্যোতির্ময় এবং মায়ারানি চৌধুরী। তাঁদের মোমোর দোকান স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
শহরের উইমেন্স কলেজ রোডের ফুটপাতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে চৌধুরী পরিবারের মোমোর স্টল। ক্রেতার সঙ্গে কথোপকথনের জন্য সেখানে শব্দের প্রয়োজন হয় না। মেনুকার্ড দেখে অর্ডার, ইশারায় প্রয়োজন বোঝানো এবং নগদ বা অনলাইন পেমেন্টে বিল মেটানো, পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে আকার-ইঙ্গিতে। ৩৮ বছরের জ্যোতির্ময় ও বছর তিরিশের মায়ারানি। দু'জনই জন্মগত ভাবে শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী। স্কুলে পড়াশোনা করে জ্যোতির্ময় উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন। মায়ারানির পড়াশোনা মাধ্যমিক পর্যন্ত। তাঁরা বাংলা ও ইংরেজিতে লিখতে পারেন। তাঁদের সাত বছরের মেয়ে শিবাঙ্গিনী চৌধুরী মালদা গার্লস স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, করোনার সময়ে প্রবল আর্থিক সঙ্কটে পড়েছিল চৌধুরী পরিবার। কোনও রোজগার ছিল না, অন্যের কাছে হাতও পাততে চাননি জ্যোতির্ময় ও মায়ারানি। বাড়িতেই স্বামী-স্ত্রী মিলে মোমো তৈরি শুরু করেন। পরে ঠেলাগাড়িতে করে উইমেন্স কলেজ রোডে বিক্রি শুরু হয় সেই খাবার। প্রথম দিকে ব্যবসা সামলাতে নানা সমস্যার মুখে পড়লেও ধীরে ধীরে ক্রেতা বাড়তে থাকে।
এখন চৌধুরীদের মেনুতে রয়েছে রকমারি আইটেম। ভেজ এবং চিকেন, দু'ধরনের মোমো পাওয়া যায়। ২৫ থেকে শুরু করে ৭৫ টাকা পর্যন্ত দামের বিভিন্ন স্বাদের মোমো। মিক্সড ভেজ, স্পেশাল ভেজ, ক্লাসিক চিকেন, চিলি পনির, গন্ধরাজ এবং চিজ কর্ন, মোট ছ'ধরনের মোমো পাওয়া যায়। মেনুকার্ড এবং অনলাইন পেমেন্টের ব্যবস্থা থাকায় কথা বলতে না পারলেও ব্যবসা চালাতে এখন বিশেষ সমস্যা হয় না।
এ সব গল্প উঠে আসে চৌধুরীদের পরিজন, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। তাঁরা দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছেন। জ্যোতির্ময়দের আত্মীয় দীপঙ্কর দাস প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রায় এক ঘণ্টা সময় দেন। ইশারা বুঝতে বা কোনও জটিল বিষয় বোঝাতে প্রয়োজন হলে তিনি সহযোগিতা করেন। ক্রেতাদের একাংশের দাবি, ওই দম্পতির মোমোর স্বাদ অন্য অনেক জায়গার তুলনায় আলাদা। খারাপ সস ব্যবহার করা হয় না। খাবারের মান এবং পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর রাখা হয়। ফলে মুখে মুখে তাঁদের দোকানের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজমাধ্যমেও দম্পতির স্বনির্ভরতার গল্প নজর কেড়েছে।
ইংরেজবাজার পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার মনীষা মণ্ডল সাহা বলেন, 'অল্প সময়ের মধ্যে ওঁদের মোমোর দোকান মালদায় পরিচিত হয়ে উঠেছে। নিজেদের মানসিক শক্তিতে ওঁরা যে ভাবে ব্যবসা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।' মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অফ কমার্সের সম্পাদক উত্তম বসাক বলেন, 'এই ধরনের স্বনির্ভর ব্যবসায়ীদের জন্য সংগঠন সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। দম্পতিকে আগামী দিনে সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।'