এই সময়: দুর্নীতির ভাণ্ডার খোলার হুঁশিয়ারি দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কারও নাম না করলেও তাঁর টার্গেট যে কে, সহজেই তা বোঝা যায় বলে তৃণমূল নেতাদের পর্যবেক্ষণ।
তৃণমূল জমানায় নিয়মিত এই ঢঙে আক্রমণ করতে দেখা যেত মমতাকে। কিন্তু পালবাদলের পরে এই প্রথম দুর্নীতি ইস্যু নিয়ে তাঁকে এই ভাবে টার্গেডেট–অ্যাটাক করতে দেখা গেল। শুক্রবার ক্যাথিড্র্যাল রোডে কালীঘাট শিবির আয়োজিত তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সভায় মমতা কারও নাম না–করে বলেন, ‘আপনাদের ভাণ্ডার খুলতে আমরা এখনও শুরু করিনি। আমাদের আমলে আপনি পরিবহণমন্ত্রী ছিলেন। হলদিয়া ডেভলপমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। আপনার বাবা দিঘা ডেভলপমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। উনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। আপনি সেচমন্ত্রী ছিলেন। টিচারের চাকরি — বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর — সব দায়িত্ব আপনি নিয়েছিলেন। ভাণ্ডার খুলব?’
অতীতে মমতা দুই মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে বিধানসভায় তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দিকে আঙুল তুলেছিলেন। সেই সময়ে পাল্টা কড়া জবাব দিয়েছিলেন শুভেন্দু। এ দিন ক্যাথিড্র্যাল রোডে মমতার সভার কিছুক্ষণ পরেই যাদবপুরে রাখিবন্ধন উৎসবের মঞ্চ থেকে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে সরাসরি মমতাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৬ হাজার চাকরি চুরি করেছেন... পিএসসি, এসএসসি, রিক্রুটমেন্ট বোর্ডগুলিকে পার্টির ক্যাডারে ভরিয়ে দিয়েছিলেন।’
আর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে গুরুত্বই দিতে নারাজ শিশির অধিকারী। প্রাক্তন এই কেন্দ্রীয়মন্ত্রী বলেছেন, ‘লোকে যাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে, যে দলের কোনও অস্তিত্ব নেই, তাঁরা কী বললেন তার উত্তর দেওয়া আমার ধাতে নেই। মানুষ যাঁদের রিজেক্ট করে দিয়েছে তাঁদের নিয়ে মন্তব্য করা সময় নষ্ট করা।’
মমতার এই ভাণ্ডার খোলার হুঁশিয়ারি নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার চালাতেন। উনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। দায় ওঁর। ওঁর দম নেই ভাণ্ডার খোলার।’
দুর্নীতি ইস্যু নিয়ে মমতা গেরুয়া শিবিরকে আক্রমণ করলেও, বাস্তবে দুর্নীতির অভিযোগে বহু তৃণমূল নেতা এখন জেলে। সেই তালিকায় সুজিত বসুর মতো প্রাক্তন মন্ত্রীও রয়েছেন। সদ্য প্রকাশিত তৃণমূল জমানার ক্যাগ রিপোর্টে উম্পুনের ত্রাণ বিতরণ থেকে বিভিন্ন দপ্তরের অনিয়মের ছবি উঠে এসেছে। কয়লা, বালি, পাথর, গোরু পাচার–সহ বিভিন্ন মামলায় ইডি–সিবিআই তদন্ত করছে।
ক্যাথিড্রাল রোড থেকে মমতার দাবি, ‘তৃণমূল খুব শীঘ্রই ক্ষমতায় ফিরবে। চুরির ইতিহাস বদলে দেবো। রাজনীতিতে ধস নামবে। যিনি বড় বড় কথা বলছেন, একদিন বিজেপির লোকেরা আপনাকে জবাব দেবে।’ গত কয়েক সপ্তাহে শুভেন্দু দুর্নীতি–সহ বিভিন্ন ইস্যুতে মমতাকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। কালীঘাটের বাড়ি থেকে মমতা যাতে রাস্তায় বেরোতে না পারেন তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শুভেন্দু। তৃণমূল নেত্রীর বয়স হওয়ায় তাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘আপনি চপ খান আর ফেসবুক লাইভ করুন।’ ক্যাথিড্রাল রোডের সভায় মমতা এ দিন বলেছেন, ‘আমাকে নাকি বেরোতে দেবে না! বুকের পাটা কত বড়! এত বড় সাহস আমি সন্ন্যাস নেব বলছেন? আগে নিজে সন্ন্যাস নিয়ে দেখান।...আমাকে ধমকে–চমকে লাভ নেই। জেলা সফর শুরু করব। অনুমতি না পেলে রাস্তায় হাঁটব। দেখব কত ডিম, ইট, গুণ্ডা আছে।’
গত ২১ জুলাই সমাবেশের আগে কোর্টে যেতে হয়েছিল তৃণমূলকে। শুক্রবারের সভা করতেও তৃণমূলকে কলকাতা হাইকোর্টের অনুমতি নিতে হয়েছে। আগামী দিনে সভা করতে তৃণমূল পুলিশের অনুমতি নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করবে না বলে এ দিন ঘোষণা করেছেন মমতা। বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন দিনের পর দিন কোর্ট থেকে অনুমতি জোগাড় করে শুভেন্দু অধিকারীকে সভা করতে হয়েছে। মমতার সরকার সভার অনুমতি দিত না।’
রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে তাঁকে নানা ভাবে অসম্মান করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন মমতা। অভিযোগ, কখনও কোনও মদ্যপ তাঁর বাড়ির সামনে এসে গালি দিচ্ছেন, কখনও তিনি বই চুরি করেছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এমনই একাধিক উদাহরণ দিয়ে মমতা বলেন, ‘আমি এত লো লেভেলে পলিটিক্স করি না। তাই জ্যোতিবাবুর বিরুদ্ধে কিছু বলিনি কোনও দিন, বুদ্ধদেববাবুর বিরুদ্ধে বলিনি, মানুদার (সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়) বিরুদ্ধে বলিনি। প্রফুল্লদার বিরুদ্ধে বলিনি। সবাইকে সম্মান দেখিয়েছি। আপনারা চুরি করে এসেছেন — সম্মান দেখাবেন কী করে?’
বিজেপি জমানায় রীতিনীতি ঠিকঠাক মানা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন মমতা। কারও নাম না–করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘স্বাধীনতা দিবসের দিন দেখলাম একটা হাফ হাতা পঞ্জাবি পরে গিয়েছে ফ্ল্যাগ তুলতে! বাড়িতে সিনিয়ররা এমন হাফ হাতা পঞ্জাবি পরেন। মিনিমাম কার্টেসি বলে — বাংলার লোকেরা ধুতির সঙ্গে পঞ্জাবি পরে।’