• ‘ছোড়দি রে, আমায় কে রাখি পরাবে?’ বিষণ্ণ জানাবাড়ি
    এই সময় | ২৯ আগস্ট ২০২৬
  • দিগন্ত মান্না, কোলাঘাট

    রাখিপূর্ণিমা আর ভাইফোঁটা— সম্বৎসরে ওই দু'টি দিনে 'ছোড়দি'র কোনও কথার অবাধ্য হয় না শ্যাম। শ্যামকুমার জানা। ক্লাস থ্রি। ওই দু'দিন 'দস্যি' শ্যাম এক্কেবারে 'লক্ষ্মী' হয়ে যায়। না–হলে 'ছোড়দি' রাগ করে যে! রেগে গিয়ে কি বকে? মারে? নাহ্‌। 'ছোড়দি' সে সব কিছু করে না। প্রথমে চুপ করে যায়। তারপরে জল টলটলে চোখে উদাস ভাবে তাকিয়ে থাকে। তাই শ্যাম ওই দু'দিন 'ছোড়দি'র মনে কোনও আঘাত দিতে চায় না।

    পিঠোপিঠি দুই ভাইবোনের কাণ্ড দেখে মা সরস্বতী মুখ টিপে হাসতেন। স্বামী শম্ভুনাথকে ইশারায় ছেলেমেয়েকে দেখিয়ে বলতেন, 'কাণ্ডটা দেখো একবার! আজ রাখি। শ্যাম কেমন শান্ত হয়ে আছে। কাল থেকে আবার দস্যিপনা শুরু করবে।' জানা দম্পতি হো হো করে উঠতেন। এ সবই এখন অতীত।

    এ বার রাখির দিনে বাড়িতে জানা দম্পতি ছিলেন। বাড়ির অন্যরা ছিলেন। শ্যাম ছিল। ছিল না শুধু 'ছোড়দি'। গত মঙ্গলবার স্কুলে যাওয়ার সময়ে পাঁশকুড়া লোকালের ধাক্কায় মারা গিয়েছে শ্যামের 'ছোড়দি', ভোগপুর কেনারাম মেমোরিয়াল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী সোমা জানা (১৪)।

    তারপর থেকে শ্যামের চেনা দুনিয়াটা বিলকুল বদলে গিয়েছে। বড় একা হয়ে গিয়েছে সে। লাটাই–ঘুড়ি পড়ে রয়েছে ঘরের এক কোণে। উঠোনে গড়াগড়ি খাচ্ছে তার সাধের গুলতি। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দুই ভাইবোনের বই। দেওয়াল ঘেঁষে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লেডিজ় সাইকেলটা। শুধু 'ছোড়দি' নেই।

    শুক্রবার রাখির দিনেই ছিল সোমার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। দূর থেকেও শোনা যাচ্ছিল খোল–করতালের আওয়াজ। আর সেই আওয়াজ ছাপিয়ে ভেসে আসছিল কান্না ও হাহাকার। আটপৌরে বাড়ির বারান্দায় রাখা নড়বড়ে একটি কাঠের চেয়ার। তার উপরে কাপড় বিছিয়ে রাখা হয়েছে সোমার একটি ছবি। ছবিতে রজনীগন্ধার পুরু মালা। সামনে কাচের গ্লাসে জল। প্লেটে মিষ্টি। একদৃষ্টে 'ছোড়দি'র ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে শ্যাম। চোখের জল মুছে সে বলে, 'এ বারের রাখি নিয়ে দিদির অনেক প্ল্যান ছিল, জানো। আমাকে রাখি পরানোর পরে খাওয়ানোরও কথা ছিল। এই প্রথম দিদি কথা রাখল না...।' শ্যামের গলাটা ধরে আসে। ফের জলে ভেসে যায় তার দুই চোখ।

    দেড়িয়াচক গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এলাকা বাঙালপুর। গ্রামের চারদিকে ভেড়ি। গ্রামের এক কিলোমিটারের মধ্যে ভোগপুর রেলস্টেশন। সেখান থেকে মোটরবাইক নিয়ে গ্রামে যেতে গিয়ে অন্তত চার বার থামতে হয়। কোথাও রাস্তা সঙ্কীর্ণ। কোথাও আবার রাস্তা নেই বললেই চলে। ঝুঁকি নিয়েই রেললাইনের একেবারে গা ঘেঁষে যাতায়াত করতে হয়। সেই পথ পেরিয়ে পৌঁছনো গেল জানা বাড়িতে।

    টালির ছাউনি দেওয়া ছোট্ট দু'কামরার ঘর। সে ঘরে ভালো ভাবে সূর্যের আলোও ঢুকতে পারে না। শ্যামের বাবা শম্ভুনাথ দিনমজুর। মা সরস্বতী গেরস্তালি সামলান। 'বড়দি' বিশেষ ভাবে সক্ষম। সংসারে টনটনে অভাব আছে। দুশ্চিন্তা আছে। তারপরেও স্বপ্ন দেখত জানা পরিবার। সাহস পেত এই ভেবে যে, ছেলেমেয়ে দুটো লেখাপড়া করে বড় হলেই সুদিন ফিরবে। শ্রী ফিরবে সংসারে। ভরসা ছিল, উপরওয়ালা নিশ্চয় একদিন মুখ তুলে চাইবে।

    গত মঙ্গলবারের পরে যাবতীয় স্বপ্ন, সাহস, ভরসা সব যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। অভাবের সংসারে বড় বুঝদার মেয়ে ছিল সোমা। পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির কাজকর্ম, বাবা–মায়ের কাজে সাহায্য, দিদি ও ভাইয়ের যত্ন নেওয়া— সব একা হাতেই সামলাত সে।

    আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সরস্বতী বলছেন, 'আর কত মায়ের কোল খালি হলে রেলবাবুদের টনক নড়বে? একটা উড়ালপুল থাকলে বা স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটা ভালো হলে কিছুতেই আমার মেয়েটাকে এ ভাবে চলে যেতে হতো না।' মায়ের কান্না দেখে ফের কঁকিয়ে ওঠে শ্যাম, 'ছোড়দি রে, আমায় রাখি পরাবে কে?' ভারী হয়ে ওঠে বর্ষার মেঘ। চরাচর জুড়ে ঝেঁপে বৃষ্টি নামে।

  • Link to this news (এই সময়)