শীর্ষেন্দু দেবনাথ
দৃশ্য–১: পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা-৩ ব্লক। চলতি সপ্তাহেই সেন্সাসের কাজে একটি এলাকায় গিয়েছিলেন গণনাকর্মীরা। স্থানীয় এক বাসিন্দার বাড়ির সামনে গাড়ি দেখে সেই তথ্য নথিবদ্ধ করতে গিয়েই বাধে বিপত্তি। পরিবারের দাবি, ওই গাড়ি তাঁদের নয়। কিন্তু সে তথ্য যে ঠিক নয়, তা ততক্ষণে জেনে ফেলেছেন ওই কর্মী-সহ বাকিরাও। স্বাভাবিক ভাবেই গন্ডগোল দেখা দিলে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়। ঘটনার কথা গড়বেতা ৩ ব্লকের বিডিও দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য মেনে নিলেও সংবাদমাধ্যমে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
দৃশ্য–২: বীরভূমের সিউড়ি সদর মহকুমায় একাধিক ব্লকে ওয়েব সিরিজ ‘পঞ্চায়েত’-এর ঘটনার একপ্রকার পুনরাবৃত্তি। ফুলেরা গ্রামের জগমোহন ও তাঁর মা সরকারি ঘর পাওয়ার জন্য ফন্দি এঁটেছিলেন! লোক দেখানো ঝগড়া করে পাকা বাড়ি ছেড়ে বৃদ্ধা পাশের ঝুপড়িতে ঠাঁই নিয়েছিলেন। সেন্সাসের কাজে গিয়েও এমন অভিজ্ঞতা। মজা করে সেন্সাসের কাজে যুক্ত এক কর্মী বলছিলেন, ‘যা বুঝলাম, বেশিরভাগই মা-বাবার থেকে আলাদা। ছেলেরা দোতালা বাড়িতে আর বাবা-মা পেপার বা টিনের ঘরে বাস করেন।’ আর এই কাজের সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়ে গিয়েছে অন্নপূর্ণা যোজনা। কী ভাবে?
অন্নপূর্ণার ফর্ম পূরণ করেও টাকা না পাওয়ার ক্ষোভে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জায়গায় প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। আর সেই ক্ষোভের আঁচ এ বার এসে পড়ছে সেন্সাসের কাজেও। প্রশাসনের দাবি, গণনার সময়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহে একাধিক জায়গায় সমস্যায় পড়ছেন গণনাকর্মীরা। সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই নিজেদের সম্পত্তি ও আর্থিক অবস্থার সঠিক তথ্য জানাতে চাইছেন না। এমনকী, বাড়ির সামনে চোখে দেখা বাইক বা গাড়ির তথ্যও ডেটাবেসে নথিভুক্ত করতে বারণ করার অভিযোগ উঠছে। অনেকের আশঙ্কা, পরিবারের সমস্ত তথ্য সরকারি ডেটাবেসে নথিভুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বা আর্থিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
কেউ তথ্য গোপন করলে ফিল্ড এনিউমারেটর বা গণনাকারীরা কী করবেন? জেলা প্রশাসনের কর্তাদের একটা বড় অংশের দাবি, বাস্তবে এগুলো খতিয়ে দেখার কোনও জায়গা নেই। গণনাকর্মী বা প্রশাসনের কাছে যে তথ্য দেওয়া হবে সেটাই নথিবদ্ধ করতে হবে। এসওপিতে কোথাও যাচাইয়ের কথা বলা নেই।
গণনাকর্মীদের একাংশের বক্তব্য, মানুষকে বোঝাতে হচ্ছে যে সেন্সাসের তথ্য এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি এক নয়। তা সত্ত্বেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভের প্রভাব পড়ছে তথ্য সংগ্রহের কাজে। প্রশাসনের সামনে এটা এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ, ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য ডেটাবেসে ঢুকে পড়লে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রকৃত ছবি পাওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এই কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অভিজ্ঞতা, ‘সবথেকে বেশি একটা প্রশ্ন পাচ্ছি তা হলো—অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার পাচ্ছি না কেন? একেবারে সিলেবাসের বাইরের প্রশ্ন।’ উত্তরবঙ্গে কর্মরত এক মহকুমা শাসক বলেন, ‘এই সমস্যা বা এমন ঘটনা যে ঘটবে তা আমরা আগেই মিটিংগুলিতে বলেছিলাম। কিন্তু এর কোনও সলিউশন বেরিয়ে আসেনি।’ কলকাতার লাগোয়া এক জেলার মহকুমা শাসক বলেন, ‘একটি পঞ্চায়েতে ডেটাবেস কালেক্ট করতে গিয়ে যা বোঝা গিয়েছে, মাইলের পর মাইল যে জমি পড়ে রয়েছে, তার কোনও মালিক নেই! যদিও এক্ষেত্রে সব বুঝলেও আমাদের করণীয় কিছুই নেই।’ এ নিয়ে ডিরেক্টরেট অফ সেন্সাস কর্তৃপক্ষের কারও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।