• এক টাকার ছোট কয়েনে আপত্তি! ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়েও সমস্যা, জেরবার সাধারণ মানুষ
    এই সময় | ২৯ আগস্ট ২০২৬
  • নির্মল বসু, বসিরহাট

    হাত পেতে ভিক্ষা চাইলেন তিনি। সেটাই তাঁর পেশা। পথচলতি যুবক পকেট থেকে এক টাকার ছোট কয়েন বৃদ্ধের হাতে দিতে গেলে হাত সরিয়ে নিলেন তিনি। ছোট এক টাকার কয়েন তিনি নেবেন না। অবাক যুবকের প্রশ্ন, কেন? উত্তরে ভিক্ষুকের জবাব, কেউ নিতে চায় না যে।

    কোনও যুক্তি নেই। স্রেফ 'কেউ নিতে চায় না' এই কারণেই উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমা জুড়ে অচল হতে বসেছে এক টাকার নতুন ছোট কয়েন। এক টাকার বড় কয়েন নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। ভিলেন শুধু এক টাকার ছোট কয়েন। আর সেই কারণে আনাজ ব্যবসায়ীও বোতলে লজেন্স-বিস্কুট সাজিয়ে বসে থাকছেন। খুচরোর সমস্যা হলেই বিকল্প হিসেবে হাতে তুলে দিচ্ছেন লজেন্স অথবা বিস্কুট। তা নিয়ে বিস্তর ঝামেলাও শুরু হয়েছে। মাঝেমধ্যে বচসা এমন পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে, যে তা মেটাতে ছুটতে হচ্ছে পুলিশকেও।

    ঘটনার সূত্রপাত কয়েক বছর আগে। তখনও একই সমস্যা হয়েছিল বসিরহাট মহকুমার বিভিন্ন এলাকায়। খুচরোর অভাব দেখা দিলে প্রশাসন সচেতনতামূলক প্রচারে নামে। তার ফলে কয়েক মাস পরে এক টাকার কয়েন নেওয়া শুরু হয়। আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কী ভাবে তার সমাধান করা যায় তা নিয়ে চিন্তিত মহকুমা প্রশাসন। প্রশাসনের কর্তা বলেন, 'শুধু এক টাকার ছোট কয়েন নয়, সমস্যা তৈরি হয়েছে 'মৃতপ্রায়' ছেঁড়া, ফাটা নোট নিয়েও। যে ১০ ও ২০ টাকার নোট বসিরহাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেগুলি পকেটেও রাখা যাচ্ছে না। চরম হয়রানির মুখে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা।'

    বসিরহাট নতুন বাজার কমিটির সম্পাদক প্রদীপ কুণ্ডু বলছেন, 'এক টাকার কয়েন নিয়ে রীতিমতো বেকায়দায় ব্যবসায়ীরা। ১০, ২০ টাকার ছেঁড়া এবং ময়লা নোটও কেউ নিতে চাইছেন না। ফলে ক্রেতাদের খুচরো দেওয়া যাচ্ছে না। তার বদলে লজেন্স, বিস্কুট দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তা নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে বচসা বাধছে।' বসিরহাটে ঘুরলে এখন দেখা যাচ্ছে মুদির দোকান, মাছ ব্যবসায়ী, অটো, টোটো, রিকশা, বাস, বাদাম, ফুচকা, চপ বিক্রেতা সকলেই প্রায় লজেন্স ও বিস্কুটের ডাব্বা সাজিয়ে বসে রয়েছেন। এ নিয়ে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করা হলে অদ্ভুত যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এক টাকার ছোট কয়েন পাশের বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে। তা গলিয়ে নাকি ধাতু তৈরি হচ্ছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় যে ছোট কয়েন বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে, তা হলে এখানকার ক্রেতারা তা নিতে চাইছেন না কেন? এ প্রশ্নের অবশ্য সদুত্তর নেই। শহরে অনলাইন পেমেন্টে সড়গড় ক্রেতা-বিক্রেতারা, ফুচকা থেকে অটো কার্যত সর্বত্রই এখন অনলাইন পেমেন্টের রমরমা। বসিরহাটের চিত্রটা ভিন্ন। খুব কম জায়গাতেই অনলাইন পেমেন্টের সুবিধে রয়েছে।

    এই আবহে গ্রামে গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে জমছে ছোট এক টাকার কয়েন ও ছেঁড়া নোট। বাড়ছে ক্ষোভ। কলেজপাড়া বাজারের আনাজ ব্যবসায়ী রতন মণ্ডল, পরিতোষ সাহাদের অভিযোগ, 'খদ্দেরদের এক টাকার ছোট কয়েন দিলে নিতে চাইছেন না। ছেঁড়া নোট নিয়ে এতই সমস্যা যে, ছোটখাটো কেনাকাটা খাতায় লিখে রাখতে হচ্ছে। তার পরিমাণ ৫০-১০০ টাকায় পৌঁছলে একসঙ্গে দিয়ে দিচ্ছেন ক্রেতা।' এটা চেনা ক্রেতাদের ক্ষেত্রে করা গেলেও অচেনা ক্রেতাদের নিয়ে সমস্যা বেশি। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে খুচরো চাইছেন। আবার লজেন্স-বিস্কুট নিতে চাইছেন না। অনেক সময়ে খুচরো এবং নোটের অভাবে বাধ্য হয়ে দু'চার টাকা কম নিতে হচ্ছে বলেও দাবি ব্যবসায়ীদের। হিঙ্গলগঞ্জ বাজারের মুদি ব্যবসায়ী চন্দ্রনাথ বাছাড়ের কথায়, '১০, ২০ টাকার নতুন পরিষ্কার নোটের যোগান ঠিকঠাক না থাকায় ঘুম কেড়েছে ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে কৃষি প্রধান এলাকায় গরিব মানুষদের বড় সমস্যা হচ্ছে।' চক্রান্তেরও ইঙ্গিত করছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ।

    বসিরহাটের একটি সরকারি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, যে পরিমাণে খুচরো টাকা দেওয়া হচ্ছে, তাতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় গ্রাহকদের। তা সত্ত্বেও কেন সমস্যা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  • Link to this news (এই সময়)