এই সময়, খড়দহ: একটা সময় পর্যন্ত পানিহাটিতে তাঁরাই ছিলেন সর্বেসর্বা। পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ এবং তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষ ওরফে পুচিকে সমীহ করে চলতেন সবাই। তাঁরাই বকলমে পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। কিন্তু রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে তোলাবাজি, লোককে ভয় দেখানো–সহ একাধিক অভিযোগে প্রথমে গ্রেপ্তার হন তীর্থঙ্কর। পরে আরজি কর হাসপাতালে খুন হওয়া তরুণী চিকিৎসকের দেহ লোপাটের অভিযোগে ওডিশা থেকে নির্মলকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতের নির্দেশে দু'জনেই আপাতত রয়েছেন পুলিশ হেফাজতে। সময়ের ফেরে বাবা–ছেলে, দু'জনেরই এখন দিন কাটছে খড়দহ থানার লকআপে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভয়ার দেহ লোপাটের মামলায় গত ১৩ অগস্ট থেকে নির্মল ঘোষ খড়দহ থানার লকআপে বন্দি রয়েছেন। এক প্রোমোটারের কাছ থেকে তোলা আদায়ের মামলায় গত শনিবার তাঁকে ফের ৭ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয় ব্যারাকপুর আদালত। সোদপুর রাজা রোডের কাছে গোপাল বর্মন নামে একজনের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় গত ২৫ অগস্ট তীর্থঙ্করকেও তিন দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত। তারই সুবাদে দু'জনেই এখন খড়দহ পুলিশ লকআপে রয়েছেন। শুক্রবার ব্যারাকপুর আদালতে তীর্থঙ্করকে হাজির করিয়ে লটারি প্রতারণা সংক্রান্ত একটি মামলায় শোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে আবারও ৭ দিনের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেয় খড়দহ থানা।
পুলিশের দাবি, লকআপের মধ্যে আর পাঁচজন বিচারাধীন বন্দি যে ধরনের সুযোগ–সুবিধে পেয়ে থাকেন, তাঁরাও সেটা পাচ্ছেন। প্রাক্তন বিধায়ক বলে তাঁরা কোনও বিশেষ সুবিধে পাচ্ছেন না। লকআপের মধ্যে কখনও বাবা ও ছেলে মিলে গল্পগুজব করছেন। কখনও আবার কম্বলে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন তাঁরা। বাবা চিরাচরিত সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে লকআপে কাটালেও, ছেলে মূলত প্যান্ট ও টি–শার্ট পরে থাকছেন। সাধারণ আসামিদের মতো তাঁদেরকেও রোজ সকালে চা–বিস্কুট, ব্রেকফাস্ট দেওয়া হচ্ছে। দুপুরে ও রাতে ভাত–রুটি, ডাল, সব্জি, মাছ, ডিম দেওয়া হচ্ছে।
পানিহাটি থানার এক পুলিশকর্মীর কথায়, লকআপে থাকার ফলে দু'জনকেই মেঝেতে কম্বল পেতে শুতে হচ্ছে। বালিশ পর্যন্ত পাচ্ছেন না। সেজন্য ওনারা ভালো করে ঘুমোতে পাচ্ছেন না। বেশিরভাগ সময় জেগেই কাটাচ্ছেন। জেরার সময় চুপচাপ থাকছেন। বেশিরভাগ প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন। ওই পুলিশকর্মীর কথায়, 'এক সময় যাঁদেরকে দেখলে আমরা স্যালুট করতাম, তাঁকে লকআপে দেখতে আমাদের নিজেদেরও খারাপ লাগছে। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। লকআপের সামনে সবসময় সিসিটিভি চলছে। ওনাকে বাড়তি কোনও সুবিধে দিলে আমরা ফেঁসে যাব।'
এ নিয়ে বিজেপি নেতা কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের কটাক্ষ, 'কথায় বলে পাপ কখনও বাপকে ছাড়ে না। গোটা পানিহাটি জুড়ে বাপ–ছেলে মিলে দশকের পর দশক ধরে যে অরাজকতা চালিয়েছেন, তার কোনও ক্ষমা নেই। আমরা চাই, প্রতিটি অন্যায় অত্যাচারের সঠিক বিচার হোক। যে দিন আদালতে ওঁদের কঠোর শাস্তি ঘোষণা হবে, সেই দিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে পানিহাটিবাসী।'