• ‘জ্যোতি বসুর দেহদান চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনও কাজে লাগেনি', স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে বিতর্ক
    eTV Bharat | ২৯ আগস্ট ২০২৬
  • কলকাতা, 28 অগস্ট: প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দেহদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেও তাঁর দান করা দেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনও কাজে লাগেনি বলে দাবি করলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায় ৷ কারণ, এআই-এর সৌজন্যে মানুষের শরীরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের থ্রি-ডি ছবি পাওয়া যাচ্ছে ৷ তাই দেহ দান করলেও তা আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজে লাগে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক-মন্ত্রী ৷

    তাই একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায় দাবি করেন, "অনেক শ্রদ্ধা করেই বলছি, ওই যে জ্যোতি বসু দেহ দান করেছিলেন, মেডিক্যাল সায়েন্সের কোনও কাজে আসেনি ৷ আরও কাজে লাগত, যদি লাইভ ডোনেশন হত ৷ যে সময় লাইফ ডোনেশন হত । যখন ব্রেন ডেড হয়ে যায় তখন যদি তাঁর অঙ্গগুলি দান করা যেত ৷ তিনি বেশ কিছু সময় ধরে ব্রেন ডেড অবস্থায় ছিলেন ৷" তাঁর এহেন বক্তব্যকে আক্রমণ করে সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, "বিজেপি সরকার এlটাই বিজ্ঞান বিরোধী যে, এখন দেহদানেও আপত্তি তুলছে ৷"

    স্বাস্থ্য মন্ত্রীর মতে, এআই যুগে মৃত্যুর পর শবদেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজে লাগে না ৷ পরিবর্তে ব্রেন ডেথের পর্যায়ে থাকা অবস্থায় অঙ্গগুলি প্রতিস্থাপনের জন্য দান করা গেলে এক থেকে একাধিক মানুষ নতুন জীবন পেতে পারতেন ৷ ব্রেন ডেথের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কার্যকর থাকতে পারে ৷ সেই সময় অঙ্গগুলি অন্য রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলে তা সরাসরি জীবন বাঁচানোর কাজে আসে ৷ তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রেন ডেথ এবং অঙ্গদানের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি ৷

    তিনি বলেন, "একজন মানুষের চোখ দু’জন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে পারে ৷ একটি হৃদ্‌যন্ত্র অন্য একজনকে নতুন জীবন দিতে পারে ৷ ফুসফুস, কিডনি-সহ একাধিক অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একাধিক মানুষ উপকৃত হতে পারেন ৷ এমনকী তাত্ত্বিকভাবে একজন মানুষের শরীরের একাধিক অঙ্গ বহু মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে ৷" তাঁর বক্তব্য, “দ্য মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ডোনেশন ইউ ক্যান ডু ইজ অর্গান ডোনেশন, অ্যান্ড নট ইউর এনটায়ার বডি ডোনেশন ৷"

    তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে দেহ দানের কোনও গুরুত্ব নেই বলে দাবি করেছেন ৷ তাঁর এহেন দাবি ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক ৷ কারণ অ্যানাটমি শিক্ষকদের একাংশের মতে, দেহদান বা ক্যাডাভার ডোনেশনের গুরুত্ব কোনওভাবে কম নয় ৷ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যানাটমি পড়াচ্ছেন ডাঃ শিবশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তাঁর বক্তব্য, “কোনও চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষা অ্যানাটমি শিক্ষা ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না ৷ আর অ্যানাটমি শিক্ষা কখনওই সম্পূর্ণ হতে পারে না ক্যাডাভার (মৃতদেহ) ছাড়া ৷"

    শিক্ষক-চিকিৎসকের বক্তব্য, অঙ্গদান এবং ক্যাডাভার ডোনেশনকে একই মাপকাঠিতে দেখা ঠিক নয় ৷ কারণ সব দেহ থেকে অঙ্গ সংগ্রহ করা যায় না ৷ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, বিশেষত ব্রেন ডেথ ঘোষিত রোগীদের ক্ষেত্রেই অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য সংগ্রহ করা সম্ভব ৷ কিন্তু ক্যাডাভার ডোনেশনের পরিধি অনেক বেশি ৷

    ডাঃ শিবশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “অঙ্গ দানের প্রয়োজন আছে ৷ কিন্তু সব দেহ থেকে তো অঙ্গ নেওয়া যায় না ৷” অন্যদিকে, একটি দেহ মেডিকেল পড়ুয়া থেকে শুরু করে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এবং বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল বিভাগের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যায় ৷ অ্যানাটমি পড়ুয়ারা ডিসেকশনের মাধ্যমে মানবদেহের গঠন সরাসরি বুঝতে পারেন ৷ পাশাপাশি গাইনি, ইএনটি, অর্থোপেডিক্স, নিউরোসার্জারি-সহ বিভিন্ন বিভাগে ক্যাডাভার ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সার্জিক্যাল দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন তিনি ৷

    এআই এবং থ্রিডি ইমেজের প্রসঙ্গও এই বিতর্কে উঠে এসেছে ৷ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে তৈরি থ্রিডি ইমেজের মাধ্যমে অ্যানাটমি শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে ৷ কিন্তু এর প্রেক্ষিতে ডাঃ শিবশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, প্রযুক্তি এগোলেও পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষায় এখনও ক্যাডাভারের প্রয়োজন রয়েছে ৷ তাই জ্যোতি বসুর দেহদানকে ঘিরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—মৃত্যুর পর একজন মানুষের শরীরের সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহার কোনটি ? স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জানিয়েছেন, ব্রেন ডেথের সময়ে অঙ্গদান করলে একাধিক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব ৷ আর অ্যানাটমি শিক্ষক বলেছেন, দেহদানও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৈরি করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷

    বিজ্ঞান মঞ্চ

    মরণোত্তর দেহদান ও অঙ্গদান সম্পর্কিত স্বাস্থ্য মন্ত্রীর মন্তব্যে তীব্র আপত্তি এবং ক্ষোভপ্রকাশ করল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ ৷ সংস্থার তরফে সৌরভ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী মরণোত্তর দেহদান করতে বারণ করেছেন এবং একই সঙ্গে অঙ্গদানে উৎসাহিত করেছেন ৷ এতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে ৷ পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ এবং গণদর্পন বহু বছর ধরে এ রাজ্যে মরণোত্তর দেহদান ও অঙ্গদান আন্দোলন গড়ে তুলেছে ৷ এই আন্দোলন আজ বহু পরিশ্রমে এক জনপ্রিয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসারে এই আন্দোলনে আজ লাখো মানুষ যুক্ত রয়েছেন- তারা বিভ্রান্ত হবেন ৷
  • Link to this news (eTV Bharat)