একদিকে হাতির আতঙ্কে গভীর জঙ্গলে যেতে চাইছেন না বহু গ্রামবাসী। অন্য দিকে, বর্ষার শেষে জঙ্গলে ফুটতে শুরু করেছে জঙ্গলমহলের অন্যতম পরিচিত বুনো ছাতু— দুর্গা ছাতু বা কাড়াঙ ছাতু। হাতির অবস্থানের কারণে জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহ করা অনেকটাই কমেছে। আর সেই কারণেই বাজারে চড়ছে দুর্গা ছাতুর দাম বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। কোনও কোনও মার্কেটে খাসির মাংসের দামকেও পিছনে ফেলেছে এই ছাতুর দাম।
মেদিনীপুরের বিভিন্ন বাজারে দুর্গা ছাতুর পসরা নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ক্রেতারা ভিড়ও জমাচ্ছেন ছাতুর দোকানগুলোতে। দাম একটু বেশি হলেও দরদাম করে সামান্য হলেও কিনছেন ক্রেতারা। বর্তমানে মেদিনীপুরে খাসির মাংসের দাম কেজি প্রতি প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। সেখানে দুর্গা ছাতু কলি অবস্থায়, অর্থাৎ পুরোপুরি না ফোটা অবস্থায় থাকলে তার দাম উঠছে কেজি প্রতি প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। আর ছাতু ফুটে যাওয়ার পরে তার দাম কিছুটা কমে দাঁড়াচ্ছে কেজি প্রতি প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।
ছাতু বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, ভালো মানের এবং বেশি পরিমাণে দুর্গা ছাতু সংগ্রহ করতে হলে অনেক সময় জঙ্গলের গভীরে যেতে হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন জঙ্গলে হাতির দল অবস্থান করায় গভীর জঙ্গলে ঢুকতে যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। ফলে অনেকেই আগের মতো জঙ্গলের ভিতরে যেতে চাইছেন না। এর জেরে বাজারে দুর্গা ছাতুর আমদানি কমেছে এবং স্বাভাবিক ভাবেই বেড়েছে দাম।
মেদিনীপুর শহরের কলেজ স্কোয়ারে ছাতুর পসারা নিয়ে বসেছেন রবি রানা। তিনি বলেন, ‘হাতির জন্যই ছাতুর দাম বেড়েছে। কলি ছাতু ১০০ টাকা প্রতি একশো গ্রাম এবং ফোটা ছাতু ৫০ টাকা প্রতি একশো গ্রাম বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়লেও মানুষ কিন্তু কিনছে। খাসির মাংস রোজ পাওয়া যাবে, ছাতু তো আর রোজ পাওয়া যাবে না।’
আরেক বিক্রেতা সবিতা মাহাতো জানালেন, বছরের এই সময়টা প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ কেজি ছাতু বিক্রি করেন। কিন্তু এ বার বিক্রি অনেকটাই কমেছে। তাঁর কথায়, ‘গভীর জঙ্গলের ভিতরে ঢোকা এখন ঝুঁকির বিষয়। সাপ রয়েছে, হাতি রয়েছে। মানুষ তো জঙ্গলে যেতে চাইছে না। আগের মতো আর এত আমদানি হচ্ছে না। পাইকারি কিনতে গেলে সেখানেই অনেক দাম দিতে হচ্ছে।’ ছাতু বিক্রেতা দীপক মাহাতো বলেন, ‘জঙ্গলের যেই দিকে হাতি নেই, সেই দিকে গিয়ে ছাতু সংগ্রহ করতে হচ্ছে।’
পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলের বিভিন্ন এলাকায় হাতির আনাগোনা রয়েছে। বিশেষ করে মেদিনীপুর সদর ব্লক, গড়বেতা, শালবনি ও গোয়ালতোড় এলাকার বিভিন্ন জঙ্গলে হাতির দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। চাঁদড়া বন বিভাগের রেঞ্জ আধিকারিক লক্ষ্মীকান্ত মাহাতোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু চাঁদড়া রেঞ্জ এলাকাতেই বর্তমানে প্রায় ১১৬টি হাতি রয়েছে। তার মধ্যে ১৮ থেকে ২০টি বাচ্চা হাতি। সব থেকে বেশি হাতি রয়েছে গাডড়ার….. জঙ্গলে। সেখানে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি হাতি রয়েছে । আমাঝরনা জঙ্গলে রয়েছে ৩০ থেকে ৩৫টি, চাউলকুড়ার জঙ্গলে প্রায় ৩০টি এবং শুকনাখালির জঙ্গলে রয়েছে ১৫ থেকে ২০টি হাতি। খাবারের সন্ধানে হাতির দল জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে।
সাধারণত বর্ষার শেষভাগ থেকে শরতের শুরুতে, অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এই ছাতু দেখা যায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গল এলাকায় শাল গাছের গোড়ায় ভেজা মাটিতে দুর্গা ছাতু জন্মাতে দেখা যায়। এ ছাড়াও ফাঁকা মাঠ, ঝোপঝাড় এবং স্যাঁতসেঁতে জায়গাতেও এই ছাতু দেখা মেলে। গ্রামবাসীদের একাংশের কাছে দুর্গা ছাতু শুধু খাবার নয়, মরশুমি আয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বর্ষার শেষে জঙ্গল থেকে ছাতু সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে অনেক পরিবার বাড়তি আয় করেন। কিন্তু এ বার জঙ্গলে হাতির উপস্থিতি সেই সংগ্রহের পথ কঠিন করে তুলেছে।
চাঁদড়া রেঞ্জের বন আধিকারিক লক্ষ্মীকান্ত মাহাতো বলেন, ‘যে সব জঙ্গলে হাতির অবস্থান রয়েছে, সেই সমস্ত এলাকার গ্রামবাসীদের বন দপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে। বিশেষ করে হাতি থাকা জঙ্গলে ছাতু, পাতা কিংবা শুকনো কাঠ সংগ্রহ করতে গভীরে না যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি গোরু, ছাগল-সহ গবাদি পশু নিয়েও জঙ্গলের গভীরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।’
১. দুর্গা ছাতু কী?
দুর্গা ছাতু বা কাড়াঙ ছাতু জঙ্গলমহলের পরিচিত একটি মরশুমি বুনো ছাতু। সাধারণত বর্ষার শেষভাগ ও শরতের শুরুতে এটি পাওয়া যায়।
২. মেদিনীপুরে দুর্গা ছাতুর দাম কত?
কলি অবস্থায় দুর্গা ছাতুর দাম বর্তমানে প্রায় ১২০০–১৫০০ টাকা প্রতি কেজি। ফোটা ছাতুর দাম তুলনামূলক কম, প্রায় ৬০০–৮০০ টাকা প্রতি কেজি।
৩. দুর্গা ছাতুর দাম এত বাড়ল কেন?
পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন জঙ্গলে হাতির দল থাকায় গভীর জঙ্গলে ঢুকে ছাতু সংগ্রহে ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে বাজারে ছাতুর আমদানি কমেছে এবং দাম বেড়েছে বলে বিক্রেতাদের দাবি।
৪. দুর্গা ছাতু কোথায় পাওয়া যায়?
পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গল এলাকায় শাল গাছের গোড়ার ভেজা মাটি, ঝোপঝাড়, ফাঁকা মাঠ এবং বিভিন্ন স্যাঁতসেঁতে জায়গায় দুর্গা ছাতু জন্মাতে দেখা যায়।
৫. হাতি থাকা জঙ্গলে ছাতু সংগ্রহ করা কি নিরাপদ?
বন দফতরের পক্ষ থেকে হাতির অবস্থান থাকা জঙ্গলের গভীরে না যাওয়ার জন্য গ্রামবাসীদের সতর্ক করা হচ্ছে। ছাতু, পাতা বা শুকনো কাঠ সংগ্রহের পাশাপাশি গবাদি পশু নিয়েও জঙ্গলের গভীরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।