• এবার গেরুয়া বনাম লালের মুখোমুখি লড়াই! কল্যাণীর বর্ধিত অধিবেশনে বার্তা সিপিএমের
    প্রতিদিন | ৩০ আগস্ট ২০২৬
  • প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান। বাংলার মাটিতে দুরমুশ ঘাসফুলের দল। শাসন ক্ষমতায় এসে শক্তি বাড়িয়েছে গেরুয়া শিবির। ফলে রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবার লড়াই সরাসরি মুখোমুখি – ‘গেরুয়া বনাম লাল’। এই পরিস্থিতিতে পথভ্রষ্ট না হয়ে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে সামনে রেখে সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার বার্তা দিল সিপিএম। বিজেপি-আরএসএসের তৈরি ‘ফাঁদে’ পা দিয়ে পার্টিকে কোনও ‘কানা গলি’তে ঢুকে পড়তে দেওয়া যাবে না বলেও সতর্ক করা হয়েছে। কল্যাণীতে শনিবার থেকে শুরু হওয়া সিপিএমের বর্ধিত রাজ্য কমিটির বিশেষ অধিবেশনে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশল নিয়ে আলোচনায় এই বার্তা উঠে এসেছে।

    সিপিএমের মতে, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। সেই বিতর্কে আটকে না থেকে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যা নিয়ে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। রাজ্যজুড়ে আন্দোলনের পাশাপাশি নিবিড় জনসংযোগই হবে পার্টির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এমনকী ‘আজাদি’ স্লোগানে লাগাম টানার কৌশলও নিচ্ছে লাল পার্টি। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজনের পাশাপাশি গরিব ও সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের নীতি কাজ করছে বলে অভিযোগ সিপিএম নেতৃত্বের। মুক্ত চিন্তার পরিসর সংকুচিত করার পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির উপরও আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে। রাজ্য সরকার কার্যত সংঘ পরিবারের নির্দেশ মেনেই এগোচ্ছে। তবে বিজেপির উত্থানের পিছনে তৃণমূলের দায় রয়েছে, এমনই মনে করছে সিপিএমের জেলা নেতৃত্ব।

    এনিয়ে তাদের ব্যাখ্যা, তৃণমূলের দুর্নীতি-স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই বাংলার মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু বিজেপিও যে স্বৈরাচারী রাজনীতির পথেই এগোচ্ছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে বলে দাবি সিপিএমের। তাই মানুষের কাছে গিয়ে বিজেপির ‘মুখোশ’ খুলে দেওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা বদলের ফলে মেরুকরণের রাজনীতির অবসান হয়েছে। এর সুফল পাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে বলে আত্মবিশ্বাসী জেলা নেতৃত্ব। বিশেষ করে সংখ্যালঘু এলাকায় পার্টির জনসমর্থন বাড়ছে বলেই দাবি। যদিও তাদের অভিযোগ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে আরএসএস। সূত্রের খবর, সংঘের এই কৌশলের মোকাবিলা কীভাবে হবে, সেই প্রশ্ন উঠে এসেছে অধিবেশনে।

    দশ বছর আগে বাংলায় সিপিএমের সাংগঠনিক প্লেনাম হয়েছিল। গত এক দশকে পার্টির সাংগঠনিক সাফল্য ও ব্যর্থতা – দুইই চিহ্নিত করে আগামী দিনের পথ নির্ধারণ করতে চাইছে অধিবেশনে আত্মসমালোচনা ও পর্যালোচনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। শনিবার কল্যাণীর মঞ্চে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘‘গত দশ বছরে পার্টির কোথায় সাফল্য, কোথায় ব্যর্থতা, কোথায় ঘাটতি – সবকিছু চিহ্নিত করেই আগামী দিনের কৌশল তৈরি করতে হবে। এই পথ চলায় প্রতিমুহূর্তে বাধা আসবে। এমনকী এই অধিবেশন আয়োজনের ক্ষেত্রেও নানা বাধা এসেছে। কিন্তু সমস্ত বাধা অতিক্রম করেই এগিয়ে যেতে হবে কমরেডদের।”

    সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবিও বাংলায় পার্টির ঘুরে দাঁড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘বাংলায় পার্টি পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারলে গোটা দেশে পার্টির রাজনৈতিক দুর্দিন কাটানো কঠিন। তাই বাংলায় সিপিএমকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।” একইসঙ্গে বিজেপির মোকাবিলায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলির বৃহত্তর ঐক্যের উপরও জোর দিয়েছেন বেবি। তাঁর মতে, বিজেপি ও আরএসএসের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটকে আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে হবে। বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্য ও জনআন্দোলনই বিজেপি এবং আরএসএসের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করতে পারে।

    কল্যাণীর অধিবেশনে তাই একদিকে গত দশ বছরের সাংগঠনিক দুর্বলতার হিসেবনিকেশ, অন্যদিকে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে জনভিত্তি তৈরির রণকৌশল – দুই দিকেই নজর সিপিএমের। তৃণমূল বিরোধী ক্ষোভে বিজেপির উত্থানের পর এবার বিজেপির বিরুদ্ধেও সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করে বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করাই বঙ্গ সিপিএমের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
  • Link to this news (প্রতিদিন)