এই সময়: আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগবতের মুখে ফের ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’। এ বার মার্কিন মুলুকে দাঁড়িয়ে ভারতের চিরন্তন সংস্কৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁকে বলতে শোনা গেল— ‘কোনও হিন্দু যদি মনে করেন যে ভারতে কোনও মুসলিমের থাকা উচিত নয়, তা হলে তিনি হিন্দুই নন।’ বরং ‘হিন্দুত্বের ধারণা’ কাউকে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলে না বলেই মন্তব্য করে সঙ্ঘ-প্রধানের বার্তা—সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলাই ভারতীয় ভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু ভারতের ‘বর্তমান রাজনীতি’ নিয়ে ভাগবতের এ দিনের পর্যবেক্ষণ নজিরবিহীন বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের। শনিবার নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘এক বিশ্ব, এক মানবতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে পথ চলার কথা আমাদের নেতারা বলে এসেছেন। স্বাধীনতার পরে আমরা যখন সংবিধান পেলাম, তখনও এই ভাবনার উপরেই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে— ভারত-ইউনিটি অফ হিউম্যানিটি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজকাল সেটা আর হচ্ছে না।’
কেন? তার উত্তরও নিজেই দিয়ে ভাগবতের সংযোজন, ‘হচ্ছে না, কারণ রাজনীতির মধ্যে দিয়ে এই ভাবনাকে লালন করা যায় না। বলতে খারাপ লাগলেও বলব— রাজনীতি এখন স্রেফ স্বার্থের খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘আমি’ বা ‘আমিত্ব’ দিয়ে কোনও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমাধানসূত্র রয়েছে ‘আমরা’ এবং ‘আমাদের’ মধ্যে।’ এর পরেই তিনি মনে করিয়ে দেন ১৯৯৬-এ হরিয়ানার একটি বিমান দুর্ঘটনার কথা। ভাগবত বলেন, ‘সে দিন ওই বিমানের বেশির ভাগ যাত্রীই ছিলেন মুসলমান। কিন্তু আমাদের স্বয়ংসেবকরা উদ্ধারকাজে নেমে বিন্দুমাত্র ভাবেননি। নিঃস্বার্থ ভাবে তাঁরা শুধুই সেবা করেছিলেন। যাঁরা মারা গিয়েছিলেন, সসম্মানে তাঁদের দেহ উদ্ধার করে যথাযথ শেষকৃত্যের বন্দোবস্তও করেছিলেন আমাদের স্বয়ংসেবকরা।’
ধর্মের পথ আলাদা হতে পারে… কিন্তু সব পথের লক্ষ্য যে এক, সত্যের সন্ধান এবং মানবতার কল্যাণ— শনিবার নিউ ইয়র্কের মঞ্চ থেকে এ কথাও বলেছেন ভাগবত। তাঁর কথায়, ‘বিভিন্ন ধর্মের নিজস্ব আচার ও উপাসনার পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু সবের পিছনে যেটা মূল সত্য, তা এক। আর সেই সত্য থেকেই মানবতার জন্ম। মানুষ তার নিজের অভিজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই পৃথিবীকে বোঝে। ফলে একই সত্যকে বিভিন্ন মানুষ বা সমাজ আলাদা ভাবে উপলব্ধি করে।’ ভাষণের একটা অংশে যথাযথ শিক্ষার পক্ষেও সওয়াল করে ভাগবত বলেন, ‘যখনই আমরা সমাজকে শিক্ষিত করা থেকে পিছিয়ে আসব, তখনই নানাবিধ বিচ্যুতি এসে আমাদের গ্রাস করবে।’
সঙ্ঘের শর্তবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে নিউ ইয়র্কে শনিবারের অনুষ্ঠান আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন খোদ সেখানকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জ়োহরান মামদানি। ভাগবত-সভায় তাঁর কীসের আপত্তি, এর ব্যাখ্যায় মামদানি বলেছিলেন, ‘শুধু ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে নয়, নিউ ইয়র্কের মতো শহরের মেয়র হিসেবেও এই সভার বিরোধিতা করছি। নিউ ইয়র্ক সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমানাধিকারে বিশ্বাসী। আজকের ভারতে তো এই বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাই উধাও হয়ে গিয়েছে।’ ভাগবতের সভা নিয়ে প্রতিবাদ জানায় ‘হিন্দুজ় ফর হিউম্যান রাইটস’, ‘ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল’-সহ কিছু সংগঠন।
একেবারে শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসে ভাগবতের মার্কিন সফরের তীব্র বিরোধিতা ও নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি তুলেছিলেন ‘দ্য ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’-এর প্রধান আসিফ মহম্মদ। যদিও অনুষ্ঠান শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে হঠাৎই সুর বদলে তিনি জানান, কাউকে আঘাত দেওয়া তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতায় দমনপীড়নের শিকার যাঁরা, তাঁদের ভালো করাই কমিশনের লক্ষ্য। তিনি ভাগবতের সঙ্গে সামনাসামনি আলোচনাতেও আগ্রহী বলে মন্তব্য করেন। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আসিফ বলেন, ‘সুযোগ থাকলে আমি আলোচনায় বসতে পারি। হতে পারে আলোচনার ফলে সচেতনতা তৈরি হবে। ওঁরাও কিছু গ্যারান্টি দেবেন, আমরাও ধারণা পাল্টাব।’ শনিবার ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনের সভা সেরে ক্যানাডা ও ব্রিটেন সফরেও যাওয়ার কথা ভাগবতের। সেখান থেকেও আবার ভাগবত-বিরোধিতার খবর আসতে শুরু করে দিয়েছে।