• পরিবর্তনের বাংলায় পুজোর থিমে রাষ্ট্রবাদ থেকে মহাকাব্য, জোর ধর্মীয় আচার-রীতিতে
    প্রতিদিন | ৩০ আগস্ট ২০২৬
  • যুগে যুগে নানা রূপে মর্তে পুজিতা হন দুর্গতিনাশিনী। কখনও ধর্মীয় উৎসবের প্রতীক তো কখনও বিপ্লবের নীরব শক্তিদায়িনী। সঙ্গে ‘রাষ্ট্রবাদ’ শব্দটি না জুড়লেও ব্রিটিশ আমলে এর উদ্দেশ্য জড়িয়েছিল রাষ্ট্রবাদের সঙ্গেই। ‘সৃষ্টি-স্থিতি বিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি।’ এই মন্ত্রেই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। বর্তমান সরকারের আমলে যেন সেই ‘সনাতনী’, ‘রাষ্ট্রবাদ’ শব্দগুলোই জুড়ে যাচ্ছে দুর্গাপুজোর সঙ্গে। ধর্মীয় আচার-রীতি মেনে পুজো আয়োজনের বার্তা দিচ্ছেন নেতা-মন্ত্রী-মহারাজরা। আর সেই পালেই হাওয়া লাগছে আধুনিক যুগের পুজোশিল্পীদের থিম ভাবনায়। ‘সনাতন’, পুরাণ, দেশপ্রেম, ‘রাষ্ট্রবাদে’র ছোঁয়াতেও যে অনন্য হয়ে উঠতে পারে থিমের সাজসজ্জা, তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে শহরের নানা পুজো।

    পুরাণ থেকে মহাকাব্য, বিপ্লব থেকে উৎসব, সর্বত্র বিরাজমান দেবী। রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের আগে দুর্গার অকাল বোধন করেন শ্রীরচন্দ্র। আবার ১৯৪০ সালে প্রেসিডেন্সি জেলে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন খোদ সুভাষচন্দ্র বসু। কারাগারের অন্তরালে তাঁর এই উদ্যোগ কেবল ধর্মীয় উৎসবের পালন ছিল না, ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মানসিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতির দুর্গাপুজোয় আবার কোনও প্রতিমা ছিল না। জীবনতারা হালদার লিখেছেন, ‘শক্তি আরধনায় কেবলমাত্র অস্ত্রশস্ত্র ছিল সম্বল। লাঠি, বশী, সড়কি, তরওয়াল, ছোরা, ভোজালি, খাঁড়া এইসব সাজাইয়া এক অপরূপ প্রতীক নির্মিত হইত এবং বাহুবলধারিণী দেবীর উপাসনা হইত। মহারাষ্ট্র হইতে ব্রাহ্মণ আমন্ত্রিত হইত এবং বৈদিকমন্ত্রে নূতন ধরনের পূজা হইত।’

    নির্ভীক-ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের পথপ্রদর্শক ছিল দেবীর আরাধনা। বলা হয়, অনুশীলন সমিতিই কলকাতায় প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপুজা প্রবর্তন করে। ইংরেজ আমলে ঋষি বৃত্তিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতেও ধুমধাম করে পুজোর আয়োজন হত। রামায়ণী গান থেকে যাত্রাপালা, মানীগুণীদের উপস্থিতিতে গমগম করত কাঁঠালপাড়ার প্রাসাদোপম চট্টোপাধ্যায় বাড়ি। কালে কালে দেবীর আরাধনার পটপরিবর্তন হয়েছে। বদলেছে উৎসবের রূপ-রস-গন্ধ। সাবেকিয়ানার সঙ্গে লেগেছে থিমের ছোঁয়া। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব কখনও গণ্য হয় ‘ওপেন আর্ট গ্যালারি’ রূপে, তো কখনও থিম ভাবনায় গৌণ হয়ে যান খোদ মা দুর্গা। স্বাধীনতার পটচিত্রও কখনও বিষয়ভাবনা হয়ে উঠেছে ঠিকই। তবে পালাবদলের বঙ্গে যেন ঘুরেফিরে আসছে সেই অতীত আমলের পুজোর গন্ধ।

    এই যেমন গৌরীবেড়িয়া সর্বজনীনের এবারের থিম ‘বঙ্কিম’। শিল্পী মধুরিমা ভট্টাচার্য বলছেন, “বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরমের সার্ধশতবর্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই এই থিম। এই জাতীয় স্তোত্রের নেপথ্যে কী দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি রয়েছে, সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করছি।” এদিকে জানবাজার এলাকার তালতলা সর্বজনীনের থিমের নামই আবার ‘বন্দে মাতরম’। ভারতের জাতীয় গানের অমৃতগাথা তুলে ধরবেন শিল্পী অমিত ও অরিন্দম। কলকাতার যে পুজোয় জনতার ঢল নামে, সেই লেবুতলা পার্ক বা সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের পুজোতেও এবার থিমভাবনা ‘সনাতনী চেতনায় বন্দে মাতরম’।

    শিল্পী শিবশংকর পাল একপ্রকার পরিষ্কার করে দিয়েছেন, এবার পুজোয় এই মণ্ডপে তাঁরা কী দেখতে চলেছেন। সৃজনেই অন্তর্নিহিত ‘রাষ্ট্রবাদ’। এখানেই শেষ নয়, এবারের পুজো দর্শনার্থীদের সামনে খুলে দেবে আস্ত রামায়ণ। রামের বনবাস থেকে সীতাহরণ, অকালবোধন আলিপুর সর্বজনীনে মণ্ডপজুড়ে মহাকাব্য আঁকবেন শিল্পী অনির্বাণ। তবে শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যজুড়ে কোথায় মণ্ডপ সাজছে রামমন্দিরের আদলে, কোথাও থিমের অনুপ্রেরণা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। অর্থাৎ এবার থিমের আধুনিকতার সঙ্গে সনাতনী ঐতিহ্যের মেলবন্ধনের সাক্ষী থাকবে বাংলা।
  • Link to this news (প্রতিদিন)