চা-বিরতিই বাঁচাল প্রাণ! নেপাল থেকে যেভাবে ফিরলেন উত্তরপাড়ার অঞ্জনা
আজ তক | ৩১ আগস্ট ২০২৬
মাত্র ১০ মিনিটের জন্য বাস থেমেছিল। একটু চা খাওয়া, শরীরটা ফ্রেশ করে নেওয়া। কে জানত, সেই ১০ মিনিটই ৬৯ বছরের অঞ্জনা সান্যাল-সহ ১৭ জনের কাছে হয়ে উঠবে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান! নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখ থেকে কোনও রকমে প্রাণে বেঁচে বাড়ি ফিরলেন উত্তরপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা অঞ্জনা সান্যাল। বাড়ি ফিরে শোনালেন সেই আতঙ্কের অভিজ্ঞতা।
উত্তরপাড়ার ব্যানার্জিপাড়া স্ট্রিটের বাসিন্দা অঞ্জনা। দীর্ঘ দিন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। অবসর নেওয়ার পর ভ্রমণই তাঁর অন্যতম পছন্দ। এ বার কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে ১৭ জনের একটি দলে তিনি নেপাল গিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা।
গত ২৬ অগাস্ট কাঠমান্ডু থেকে চিনের ইমিগ্রেশন অফিসের দিকে যাচ্ছিল তাঁদের বাস। পথের মধ্যে আচমকাই বাস থামানো হয়। যাত্রীরা নেমে চা খান, একটু ফ্রেশ হয়ে নেন। সব মিলিয়ে সময় লাগে প্রায় ১০ মিনিট। তার পর ফের রওনা দেয় বাস।
কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। চালকের কাছে খবর আসে, সামনে নদীতে আচমকা হড়পা বান এসেছে। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বাস ঘুরিয়ে কাঠমান্ডুর দিকে ফিরতে শুরু করেন তিনি।
অঞ্জনার কথায়, তাঁরা যখন রওনা দিয়েছিলেন, তখন আকাশ ছিল একেবারে পরিষ্কার। চার দিকে রোদ। আচমকা কিছুটা দূরে ধোঁয়ার মতো একটি বিশাল মেঘ দেখা যায়। চোখের সামনে সেই দৃশ্য বদলে যায়। নদীর জল যেন পাহাড়ের উপর থেকে মেঘের মতো নেমে আসতে থাকে।
মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখে আতঙ্কে কেঁদে ফেলেছিলেন অঞ্জনা। তাঁর কথায়, চালক যদি সময়মতো বাস ঘুরিয়ে না দিতেন, তা হলে বড় বিপদ ঘটে যেতে পারত। সামান্য আরও এগিয়ে গেলে বাস হয়তো রাস্তায় যানজটে আটকে যেত। তখন আর বাস ঘোরানোর সুযোগ থাকত না।
অর্থাৎ, মাত্র কয়েক মিনিটের এ দিক-ও দিকেই বদলে যেতে পারত ১৭ জনের ভাগ্য। সেই ১০ মিনিটের চা-বিরতিই কার্যত তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়ে দিল বলে মনে করছেন অঞ্জনা।
নেপালের এই বিপর্যয় নিয়ে চিনের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। অঞ্জনার অভিযোগ, হিমবাহ ভেঙে যাওয়ার পর নেপালের হাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় ছিল। আগে থেকে সতর্কবার্তা পৌঁছলে হয়তো আরও অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হত।
তবে এত ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরেও কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার ইচ্ছা একটুও কমেনি অঞ্জনার। বরং অপূর্ণ থেকে যাওয়া সেই যাত্রা শেষ করার ইচ্ছাই এখন আরও প্রবল। এ বারই ছিল তাঁর কাছে কৈলাস যাওয়ার শেষ সুযোগ। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
আগামী বছর ৭০ বছরে পা দেবেন অঞ্জনা। তাঁর আশঙ্কা, তখন হয়তো আর যাত্রার অনুমতি পাওয়া কঠিন হতে পারে। তবে তাতেও দমছেন না তিনি। প্রয়োজন হলে হেলিকপ্টারে করে কৈলাসের আকাশপথে দর্শন করবেন বলে জানিয়েছেন। মানস সরোবরের জল মাথায় দেওয়ার ইচ্ছাও এখনও রয়ে গিয়েছে তাঁর।
দীর্ঘ দিন ধরেই ভ্রমণ করতে ভালবাসেন অঞ্জনা। দেশ-বিদেশের বহু জায়গায় ঘুরেছেন। কিন্তু নেপালের এই সফর তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল।
অঞ্জনার কথায়, কৈলাসের এত কাছে গিয়েও দর্শন না হওয়ায় তাঁর মনে হয়েছিল, 'আমি এমন কী পাপ করেছি?' কিন্তু মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর তাঁর মনে হয়েছে, হয়তো কোনও পুণ্যের ফলেই নতুন জীবন পেয়েছেন।
নেপালে আটকে পড়া পর্যটকদের দেশে ফেরাতে রাজ্য সরকারের তরফে সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সরকারের এই উদ্যোগকে ভাল পদক্ষেপ বলেই জানিয়েছেন অঞ্জনা। তবে তার আগেই তিনি ট্রেনে ভারতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন।
রবিবার ভোরে মিথিলা এক্সপ্রেসে হাওড়ায় পৌঁছন অঞ্জনা সান্যাল। ভয়াবহ স্মৃতি সঙ্গে নিয়েই উত্তরপাড়ার বাড়িতে ফিরেছেন তিনি। কিন্তু নেপালের সেই আতঙ্কও তাঁর কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের ইচ্ছাকে মুছে দিতে পারেনি।