স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা বহুমাত্রিক, ‘দেশদ্রোহী’ তকমা মুছে বিজেপিকে বার্তা সিপিএমের
প্রতিদিন | ৩১ আগস্ট ২০২৬
গেরুয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামার বার্তা আগেই দিয়েছিল লাল পার্টি। এবার বিজেপির ‘দেশদ্রোহী’ তিরের মুখে জবাব দিতে নতুন পথে হাঁটল সিপিএম। আসলে রাষ্ট্রবাদী না দেশপ্রেমিক? স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরেও যেন সেই পুরনো প্রশ্নই নতুনভাবে ফিরে এসেছে রাজনৈতিক মঞ্চে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই আবহে কল্যাণীর ঋত্বিক সদনে সিপিএমের বর্ধিত অধিবেশনে খোঁজা হল তারই উত্তর। প্রবেশপথে একের পর এক মুখ – বিপ্লবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বদের ছবি। তাঁদের জীবন ও সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে।
দেশজুড়ে গেরুয়া শক্তি আকাশচুম্বী হতেই কমিউনিস্টদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক প্রচেষ্টার পালটা বয়ান হিসেবেই এই প্রদর্শনীকে দেখছে সিপিএম। ঋত্বিক সদনের প্রবেশপথে সেই ইতিহাসই যেন ছবিতে ছবিতে কথা বলছে। সেখানে জায়গা পেয়েছেন মেজর জয়পাল সিং, সরোজ মুখোপাধ্যায়, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, গণেশ ঘোষ, কল্পনা দত্ত, মাস্টারদা সূর্য সেন, এ কে গোপালন, হরকিষেণ সিং সুরজিৎ, মুজফ্ফর আহমদ, লক্ষ্মী সেহগল, চন্দ্রশেখর আজাদ, আশফাকুল্লা খান, ভগৎ সিং, পি সি জোশি, এম এন রায়-সহ বহু পরিচিত ও বিস্মৃত মুখ।
তালিকাটি নিছক কোনও রাজনৈতিক দলের নেতাদের তালিকা নয়। বরং স্বাধীনতার লড়াইয়ের বহুস্রোতকে এক ফ্রেমে ধরার চেষ্টা! কেউ সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছেছিলেন, কেউ শ্রমিক-কৃষকের সংগঠন গড়েছিলেন, কেউ কারাগারে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন, কেউ স্বাধীনতার পরও সামাজিক-অর্থনৈতিক সমতার লড়াইয়ে যুক্ত থেকেছেন। গণেশ ঘোষের মতো বিপ্লবী, যিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরবর্তী জীবনে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় হন, সেই ধারাবাহিকতার অন্যতম প্রতীক। আর সেই কারণেই প্রদর্শনীর দেওয়ালে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ ও কমিউনিস্ট রাজনীতির দুই ভিন্ন স্রোত।
ইতিহাসের পথ সবসময় সরলরেখায় এগোয় না। একই মানুষ জীবনের এক পর্যায়ে সশস্ত্র বিপ্লবী, পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট – আবার কেউ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে শ্রমিক-কৃষকের অধিকারের সংগ্রামে পা বাড়িয়েছেন। এই বহুমাত্রিকতাই প্রদর্শনীর মূল বক্তব্য বলে জানান পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী। ঋত্বিক সদনের ভিতরে প্রবেশের মুখে আর এক ইতিহাস অপেক্ষা করছে – স্বাধীনতা সংগ্রামে নদিয়া জেলার ভূমিকা। ফলে প্রদর্শনীটি শুধু সর্বভারতীয় ইতিহাসের মুখগুলি তুলে ধরেনি, স্থানীয় মাটি ও মানুষের সংগ্রামকেও সেই বৃহত্তর স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। নদিয়ার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসও এই প্রদর্শনীতে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
আজকের রাজনৈতিক বিতর্কে সেই পুরনো ইতিহাসই নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে। একদিকে ‘রাষ্ট্রবাদে’র ভাষা, অন্যদিকে ‘দেশপ্রেমে’র সংজ্ঞা নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন। তার মাঝখানে কল্যাণীর ঋত্বিক সদনের দেওয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ভগৎ সিং, সূর্য সেন, প্রীতিলতা, গণেশ ঘোষ, কল্পনা দত্ত, মুজফ্ফর আহমদ বা এম এন রায় যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনও একটা রঙের একচ্ছত্র অধিকার নয়। ইতিহাসের রং অনেক। সেই রঙের মধ্যে লালও আছে। কল্যাণীর ঋত্বিক সদনের প্রবেশপথের এই প্রদর্শনী তাই নিছক ছবি প্রদর্শনী নয়, ইতিহাস ঘিরে চলতে থাকা বর্তমানের রাজনৈতিক বিতর্কের সামনে রাখা একগুচ্ছ প্রশ্ন।