• ভালোবাসার প্রমাণ রাখার মরিয়া চেষ্টা, প্রেমের জোয়ারে ধ্বংস মামা-ভাগ্নের সৌন্দর্য
    প্রতিদিন | ৩১ আগস্ট ২০২৬
  • “পাথরে লেখো নাম, পাথর ক্ষয়ে যাবে, হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে” – প্রায় ৫২ বছর আগে মান্না দে-র কণ্ঠে উচ্চারিত সেই অমর পংক্তি যেন আজ অন্য অর্থে ফিরে এসেছে দুবরাজপুরের মামা-ভাগ্নে পাহাড়ে। হৃদয়ের পাতায় প্রেমের নাম লেখার বদলে পাথরের বুকেই তা খোদাই করে চিরস্থায়ী করতে চাইছেন একাংশ প্রেমিক-প্রেমিকা। আর সেই ভালোবাসার মাশুল দিতে হচ্ছে প্রকৃতিকে।

    সমতলের বুক চিরে হঠাৎ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা মামা-ভাগ্নে পাহাড় এমনিতেই তার অনন্য ভূপ্রকৃতির জন্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র। বিশালাকার পাথরগুলি একে অপরের উপর আশ্চর্য ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছে এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য। সেই পাথরের ফাঁকে তৈরি ছোট ছোট গুহার মতো জায়গা বর্ষায় আড়াল, গ্রীষ্মে ছায়া আর শীতে উষ্ণতার আশ্রয় দেয়। স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিন ধরে প্রেমিক-প্রেমিকাদের কাছেও পাহাড়টি হয়ে উঠেছে একান্ত সময় কাটানোর পছন্দের জায়গা।

    কিন্তু সেই ভালোবাসার স্মৃতিই এখন পাহাড়ের গায়ে ক্ষতের মতো দাগ হয়ে ফুটে উঠছে। কোথাও পাশাপাশি লেখা হয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকার নাম, কোথাও প্রিয়জনকে উদ্দেশ্য করে বার্তা। কেউ ইট কিংবা চক দিয়ে লিখে চলে যাচ্ছেন, আবার কেউ আরও একধাপ এগিয়ে ধারালো পাথর বা লোহার শিক দিয়ে পাথরের গায়ে নাম ও বার্তা খোদাই করছেন। উদ্দেশ্য একটাই—প্রেমের স্মৃতিকে ‘চিরস্থায়ী’করা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রবণতায় ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে মামা-ভাগ্নে পাহাড়ের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের আনাগোনায় এমনিতেই ব্যস্ত এই ঐতিহাসিক স্থান। তার উপর পাথরের গায়ে রং, লেখা ও খোদাইয়ের দাগে তৈরি হচ্ছে দৃশ্যদূষণ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পাহাড়ের পাথুরে গঠনও।

    পরিবেশবিদদের মতে, পাথরে নাম খোদাই করে ভালোবাসা প্রকাশ আসলে ভালোবাসার প্রকাশ নয়, প্রকৃতির উপর এক ধরনের অপপ্রয়াস। শুধুমাত্র আইন করে এই প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানুষের বিবেককে জাগ্রত করা এবং প্রকৃতিকে নিজের সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করা। প্রশাসনের এক কর্তার কথায়, পাথরের উপর রং দিয়ে লেখা কিংবা খোদাই করার ফলে পাহাড়ের ক্ষতি হচ্ছে। বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। কীভাবে এই প্রবণতা রোখা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। প্রেম যদি সত্যিই অমর হয়, তবে তার জন্য পাথরের বুক ক্ষতবিক্ষত করার প্রয়োজন কোথায়? হৃদয়ে লেখা নামই বরং থাকুক অক্ষয়—মামা-ভাগ্নে পাহাড় তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নিয়েই বেঁচে থাকুক।
  • Link to this news (প্রতিদিন)