• ‘সামনে যেন রাক্ষসের হাত এগিয়ে আসছে, সঙ্গে সঙ্গে বাসের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নেওয়া হলো’
    এই সময় | ৩১ আগস্ট ২০২৬
  • নেপালের হড়পা বানের সম্মুখীন হয়েছিলেন বীরভূমের সিউড়ির বাসিন্দা সন্দীপ দেব। চোখের সামনে দেখেছেন সেই বিপর্যয়। ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা শোনালেন এই সময়কে।

    স্কুলে মানসরোবর নিয়ে একজন এসে আমাদের ফটো দেখিয়েছিলেন। সেটা অনেক বছর আগে, তখন আমি ক্লাস ফাইভ-এ পড়ি। তখন থেকে আমার শখ কোনওদিন মানসরোবর দর্শন করব। ঈশ্বর আমাকে চেয়েছেন। ২১ অগস্ট আমরা বেরিয়েছিলাম। কলকাতার একটা নামি পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে আমরা সর্বমোট ৫২ জন গিয়েছিলাম। তার মধ্যে ম্যানেজার নিয়ে আমরা ১৮ জন ছিলাম বাঙালি, বাকি সবাই দক্ষিণ ভারতীয়।

    আমরা ২১ অগস্ট হাওড়া থেকে মিথিলা এক্সপ্রেসে করে কাঠমান্ডুতে যাই। কাঠমান্ডুতে গিয়ে অপেক্ষা করি। ভিসা আসেনি। আমরা ২৩ তারিখে কাঠমান্ডুর আশেপাশের জায়গা ঘুরে ভেবেছিলাম ভিসা পেয়ে গেলে ২৪ তারিখে বেরিয়ে যাব। ২৪ তারিখেও ভিসা আসেনি। ২৪ তারিখ রাতে আমাদের খবর দেওয়া হলো যে ভিসা এসেছে। খুবই আনন্দের খবর।

    ২৫ তারিখ সকালবেলায় অন্য একটি কলকাতার নামি পর্যটন সংস্থা বেরিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, আমরা ২৬ তারিখ খুব আনন্দের সঙ্গে পুজো-পাঠ করে যাত্রা শুরু করলাম কৈলাস এবং মানসরোবরের দিকে।

    আমরা কাঠমান্ডু থেকে ততক্ষণে মোটামুটি ৫০ থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূর বিদুড় বলে জায়গাটায় গিয়েছি, জেলা হচ্ছে নুওয়াকোট। সেখানে হঠাৎ করে দেখছি আমাদের বাসটা এগোচ্ছে এবং প্রচুর লোক আমাদের বাস যাওয়ার বিপরীত দিকে ছুটছে। বাসের ড্রাইভার, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে গতি কমিয়ে দেয়। আমাদের জানায়, ল্যান্ডস্লাইড হয়েছে।

    যে হেতু আমি অনেক পাহাড়ের ট্রেক করেছি, ভেবেছিলাম ল্যান্ডস্লাইড হলে এক-দু'ঘণ্টার মধ্যে রাস্তা খুলে যাবে। তার পরে যে দৃশ্যটা সামনে এল, সেটা ভয়ানক দৃশ্য। দেখছি দূর থেকে একটা বিশাল কাদা-জল মাখানো ঢেউ, যেন রাক্ষসের হাত এগিয়ে আসছে। সেটা দেখে বাসের স্টিয়ারিং সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়ে নেওয়া হলো।

    সামনে যে ব্রিজটা ছিল, আমরা যদি আর একটু অর্থাৎ ৫ থেকে ৭ মিনিট ড্রাইভিং করা হতো, তা হলেই মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। ভগবান শিবশম্ভুর অশেষ কৃপায় আমরা বেঁচে গিয়েছি। ব্রিজটা চোখের সামনে ভেঙে গেল। এছাড়া যাত্রাপথে মাঝখানে দু'বার আমরা ব্রেক নিয়েছিলাম। ওই দু'বার ব্রেক নেওয়ার জন্যই আমরা বেঁচে গেলাম।

    ব্রিজটা ভেঙে যাওয়ার পরে আমাদের ড্রাইভার এবং আমাদের আরও দুটো গাড়ির ড্রাইভার কোনওরকমে গাড়ি ঘুরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যে পথটা দিয়ে এসেছিলাম, সেই পথ দিয়েই বাঁ দিকে একটা রাস্তায় উঁচুর দিকে উঠে যায়, সেখানে উঠিয়ে একটা জায়গায় থামায়। সেখানকার লোকেরাও বলছে, 'এখানেও সেফ নয়, জল চলে আসতে পারে।' আবার ড্রাইভার আরও উঁচুতে নিয়ে যান। যাই হোক, ওদিকটায় জল আসেনি। জলটা ব্রিজটাকে ভেঙে রাস্তার কিছুটা ক্ষতি করে ডান দিকে একটা পাহাড়ের খাদে নেমে চলে গেল।

    এর পরেই দেখলাম মানুষের আর্তনাদ আর বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো স্কুল থেকে বেরিয়ে আসছিল। বাচ্চাগুলো ছুটছে, মা-বাবারা সেই ছোট ছোট বাচ্চাদের কোলে তুলে রাস্তা থেকে ওই উঁচু পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে কী ভাবে যে ছুটে আসছিল, সে দৃশ্য ভোলা যাবে না। ওই হাহাকার, ওই আর্তনাদ! তার পরে আশপাশে দেখছি সবাই কাঁদছেন, আমরা তখনও ব্যাপারটা অতটা গুরুত্ব বুঝতে পারিনি। তবে এটা বুঝতে পারছি যে ব্রিজটা যখন ভেঙেছে, তখন নিশ্চয়ই আরও কিছু ক্ষতি হয়েছে। এর মাঝে আমাদের কাছে খবর এল, চিন সীমান্ত যাওয়ার সমস্ত পুল এবং সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি ওখানটায় দাঁড়িয়েছিলাম মোটামুটি এক ঘণ্টার মতো।

    যাই হোক, ভগবানের অশেষ কৃপা আমরা বেঁচে এসেছি। তার ঠিক ১ ঘণ্টা পরে গাড়ি আবার ব্যাক করল। যে রাস্তা দিয়ে এসেছি, খবর নিয়ে নিলাম যে রাস্তায় এসেছি, সেই রাস্তাটাতে কিছু হয়নি। জলস্রোত পাশ দিয়ে বেরিয়ে চলে গিয়েছে। সেই রাস্তায় এসে কাঠমান্ডুতে যখন পৌঁছই, তখন একের পর এক ভিডিয়ো দেখি ফেসবুকে, ইউটিউবে। সেগুলো দেখার পরে আরও যেন বিভীষিকা মনে হয়। আমরা কাঠমান্ডু থেকে নেপালের বীরগঞ্জে এসে হোটেলে ছিলাম। সেখান থেকে গতকাল (শনিবার) সকাল ১০টা ১০-এ মিথিলা এক্সপ্রেস করে রাতের বেলা আমি দুর্গাপুরে নামি এবং ভোরবেলায় সাড়ে চারটে বাস ধরে আমি সিউড়িতে পৌঁছই।

    বাড়ি ফিরে সত্যিই খুব স্বস্তি লাগছে। তবে বার বার মনে পড়ছে এত এত মানুষের হাহাকার আর বাচ্চাদের চিৎকার— জানি না কত মানুষ ভেসে গিয়েছে। প্রকৃতির এরকম ভয়ানক রূপ স্বচক্ষে দেখলাম। আমি পাহাড়ে বহু ট্রেকিং করেছি, আমি কখনও এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি। এবার যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি, সেটা ভয়াল ও ভয়ঙ্কর এবং পরে বুঝতে পারছি যে নেপালে এর আগে এত বড় বিপর্যয় কোনওদিনও হয়নি।

  • Link to this news (এই সময়)