• সাবেক দাঁড়িপাল্লায় নির্ভুল ওজন, টুইলার দোকানে ভিড় ক্রেতাদের
    এই সময় | ৩১ আগস্ট ২০২৬
  • শীতল চক্রবর্তী, গঙ্গারামপুর

    এক হাতের একটু বেশি লম্বা কাঠ। গায়ে বসানো রয়েছে তিনটি লোহার পেরেক। চারদিকে ঘুণ ধরে কাঠ ক্ষয়ে গিয়েছে। এই বস্তুটিকে দেখতে কৌতূহলী মানুষ নিয়মিত ভিড় করছেন বাজারে। কী এই বস্তুটি? কাঁঠাল কাঠের টুকরো দিয়েই তৈরি অভিনব দাঁড়িপাল্লা। ৬৪ বছর পার হয়ে গেলেও এই দাঁড়িপাল্লায় নির্ভুল ওজন করা যায়। দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর শহরের মিশন মোড়, পান সমিতি বাজারে এটাই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

    বিরল কাঠের দাঁড়িপাল্লার মালিক এই ব্লকের দমদমা গ্রাম পঞ্চায়েতের কালদিঘি রতনমালা এলাকার এক কৃষক। ৮০ বছর বয়সি আদিবাসী কৃষক টুইলা হাঁসদা ছেলে ও পুত্রবধূকে নিয়ে থাকেন। বাড়িতে চাষ করেন পটল, আলু ও শাকসব্জি। পান সমিতি বাজার, শিববাড়ি হাট ও মিশনমোড়ে বিক্রি সে সব করেন। ক্রেতাকে আলু, আনাজ ওজন করে দেওয়ার সময়ে তাঁর ভরসা ১৯৬২-তে তৈরি কাঠের দাঁড়িপাল্লা।

    কী ভাবে কাজ করে এটি? কাঠের টুকরোর গায়ে বসানো রয়েছে তিনটি লোহার পেরেক। প্রথম পেরেকটি এক কেজি, দ্বিতীয়টি ৫০০ গ্রাম এবং তৃতীয়টি ২৫০ গ্রামের মাপ নির্দেশ করে। মাঝখানে বাঁধা রয়েছে একটি শক্ত রশি, যার সাহায্যে ভারসাম্য রেখে ওজন করা হয়। দুই পাশে ঝোলানো পাল্লা না থাকলেও কাঠের দণ্ডটির নির্দিষ্ট ভারসাম্যের বিন্দুগুলিই এই দাঁড়িপাল্লার আসল বৈশিষ্ট্য।

    ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক ওজন মাপার যন্ত্রই এখন সব ব্যবসায়ীর কাছে। সাধারণ দাঁড়িপাল্লার ব্যবহারই কমে এসেছে। তারও আবার একটি আদি ভার্সন পাল্লা দিয়ে সঠিক ওজন জানিয়ে চলেছে। সেটাই পরখ করতে অনেকেই চলে আসছেন টুইলার কাছে আলু-পটল কিনতে। কেউ ওজন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও সঙ্গে সঙ্গে তা মেপে দেওয়া হচ্ছে অন্য বিক্রেতার যন্ত্রে।

    সম্প্রতি এক যুবক টুইলার কাছ থেকে ৫০০ গ্রাম আলু ও পটল কেনার পরে ওজন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। আধুনিক দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেখা যায়, কাঠের দাঁড়িপাল্লায় মাপা ওজন একেবারে নির্ভুল। টুইলা বলেন, 'আমার বাবা এই দাঁড়িপাল্লা তৈরি করেছিলেন। এত বছর খুব যত্নে রেখেছি। আজও ওজন একদম ঠিক হয়। তাই এখনও এটিই ব্যবহার করি।'

    মেট্রিক পদ্ধতি চালু হওয়ার আগে গ্রামবাংলায় সের, ছটাক, তোলা বা আশিতোলা প্রভৃতি এককে ওজন করা হতো। সেই সময়ে অধিকাংশ গ্রামীণ মানুষ সহজলভ্য কাঁঠাল, শিমুল বা অন্যান্য শক্ত কাঠ দিয়ে ভারসাম্য-নির্ভর দাঁড়িপাল্লা তৈরি করতেন। নির্দিষ্ট দূরত্বে পেরেক বা খাঁজ বসিয়ে বিভিন্ন ওজনের মাপ নির্ধারণ করা হতো। সঠিক ভারসাম্য বজায় থাকলে এই দেশীয় দাঁড়িপাল্লাগুলি ওজন মাপার ব্যাপারে ছিল অত্যন্ত নির্ভুল।

    প্রতিবেশী থেকে আশপাশের বিক্রেতারা টুইলার দাঁড়িপাল্লার কেরামতি ভালোই জানেন। প্রতিবেশী সিমন কুজুর বলেন, 'নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এত পুরোনো কাঠের দাঁড়িপাল্লা এখনও এত নিখুঁত ভাবে ওজন করছে, এটা সত্যিই আশ্চর্যের।' মিশনমোড় এলাকার ব্যবসায়ী খারিজ আলি ও বিভাস দাস বলেন, 'আগেকার দিনে ভারসাম্যের হিসেব মেনে এই ধরনের দাঁড়িপাল্লা তৈরি হতো। আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেও এর ওজনে কোনও তফাৎ পাওয়া যায়নি।'

  • Link to this news (এই সময়)