কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
চক্ষুদান। শুধু প্রতিমার নয়, ওঁদেরও। জন্মাবধি নিশ্ছিদ্র অন্ধকার দেখে আসা চোখগুলি এ বছর প্রাণভরে রং আর আলো ঝলমলে শহরের সৌন্দর্য শুষে নেবে আনন্দে। ভরদুপুর আর মাঝরাতের ফারাক করতে পারত না যে চোখজোড়া, তারাই এ বার গল্পে শোনা মা দুর্গার অসুরনিধন দেখবে মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে। থিমের বৈচিত্র থেকে শুরু করে সাবেকিয়ানার আভিজাত্য— সব ধরা পড়বে ওই চোখে। একটি পুজো কমিটির উদ্যোগ ও চেষ্টায় এমনটা হতে চলেছে। সল্টলেক এডি ব্লক রেসিডেন্টস ক্লাব দুর্গোৎসব কমিটি। ওই পুজোর এ বার ৪৮তম বছর।
দেবীপক্ষের সূচনায় প্রতিমাশিল্পীর তুলি নিবদ্ধ হয় প্রতিমার চোখের সামনে। মনঃসংযোগকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে গিয়ে তুলির নির্ভুল টানে মা দুর্গার চোখ আঁকা হয়। দুর্গাপুজোর যে আচার বা প্রথাকে বলে 'চক্ষুদান'। মায়ের চক্ষুদান। তবে এ বছর সল্টলেক এডি ব্লক রেসিডেন্টস ক্লাব দুর্গোৎসব কমিটির সদস্যদের কাজ শুধু মৃণ্ময়ী প্রতিমার চক্ষুদান করেই শেষ হচ্ছে না। কমিটির পরিকল্পনা হলো, দৃষ্টিহীনদেরও 'চক্ষুদান'–এর ব্যবস্থা করা। এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাঁদের আনতে পারা গেল, তাঁদের ঘুরিয়ে দেখানো হবে সল্টলেকের ওই পুজো এবং আশপাশের মণ্ডপ ও প্রতিমা। এ ব্যাপারে তাঁরা ইতিমধ্যেই সুশ্রুত আই ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের সঙ্গে টাইআপ করেছেন। তা ছাড়া, পুজো কমিটি যোগাযোগ রাখছে চক্ষুদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও। আগামী দু'মাসে আলোর দৃষ্টি পাবেন, এমন বেশ কয়েক জনকে বেছে নিয়ে পুজো কমিটি শামিল করবে তাদের উদ্যোগে।
পুজো কমিটির সদস্যরা এ–ও জানাচ্ছেন, পুজোর আগে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ফলে দৃষ্টি ফিরে পাওয়া কোনও বালিকাকে দিয়ে পুজোমণ্ডপ উদ্বোধন করানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। সল্টলেকের এডি ব্লক রেসিডেন্টস ক্লাব দুর্গোৎসব কমিটি রবিবার একটি চক্ষুদান অঙ্গীকার শিবিরের আয়োজনও করেছিল। ওই দুর্গাপুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট এবং উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শঙ্কর চৌধুরী বলছেন, 'রবিবার চক্ষুদান অঙ্গীকার শিবিরের আয়োজন করে আমরা আনুষ্ঠানিক ভাবে এই উদ্যোগকে পুজোর সঙ্গে যুক্ত করলাম। এ বছর শুরু হলো, তবে এ বার থেকে আমাদের পুজো কমিটি সব সময়ে এই উদ্যোগের সঙ্গে থাকবে।'
জনকল্যাণকর সংগঠন 'রাজবলহাট কালচারাল সার্কল' ইতিমধ্যেই ১২০০–র বেশি মরণোত্তর চক্ষুদানের সঙ্গে যুক্ত। ওই সংগঠনের তরফে সুরজিৎ শীল বলছেন, 'সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। অজস্র ক্যাম্প এবং সচেতনতামূলক প্রচারে যতটা কাজ হয়, একটা পুজো কমিটির এ রকম উদ্যোগ তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে এই ধরনের জনকল্যাণকর প্রচারকে পৌঁছে দিতে পারে। তাই, সল্টলেকের ওই পুজো কমিটির উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি।'
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত দৃষ্টিহীনতার নেপথ্যে থাকে কর্নিয়ার সমস্যা। তাই, চক্ষুদানের সিদ্ধান্ত বহু মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে। মৃত্যুর ছ'ঘণ্টার মধ্যে চোখ থেকে কর্নিয়া সংগ্রহ করতে হয়। আর সপ্তাহ খানেকের মধ্যে (সংরক্ষক দ্রবণ সর্বোচ্চ মানের হলে বড়জোর ১৪ দিন) সেই কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করতে হয় দৃষ্টিহীনের চোখে। তাতে ফিরে আসে দৃষ্টি। তবে শুধু চক্ষুদানের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়, একই সঙ্গে প্রয়োজন বেশ কিছু সতর্কতা এবং কর্নিয়াকে তাজা ও ব্যবহারযোগ্য রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি কিছু পদক্ষেপ। তার জন্য কী করা উচিত, সেই সচেতনতা খুব জরুরি। সল্টলেক এডি ব্লক রেসিডেন্টস ক্লাব দুর্গোৎসব কমিটির সদস্যদের আশা, তাঁদের উদ্যোগের মাধ্যমে ওই প্রচার আগামী দিনে বহু মানুষের কাছে পৌঁছবে।