• চিনির ঝাঁঝ বাজারে, ভোগের হাঁড়িতে বিশ্বাসের মিষ্টি, নবদ্বীপে নিয়মে ভাটা পড়ল?
    এই সময় | ৩১ আগস্ট ২০২৬
  • নিলয় ভট্টাচার্য

    চিনির স্বাদ নোনতা। নেপথ্যে দামের বাড়াবাড়ি। রান্নাঘর থেকে চায়ের দোকান, মিষ্টির ভিয়েন — সর্বত্রই টানাটানি। তবে ভোগের হাঁড়িতে অন্য ছবি। চিনির দামের আঁচ সেখানে লেগেছে ঠিকই, তবে নিত্যভোগের থালায় তার ছাপ পড়েনি তেমন। এ যেন ‘যে খায় চিনি, তারে জোগায় চিন্তামণি’-র মতো, সবই তাঁর লীলা।

    দুধ ফুটছে। তার মধ্যে পড়ছে চাল। ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে পায়েস। সঙ্গে মিশছে চিনি। কেজি কেজি। দুধের সাদা শরীরে গলে গলে যাচ্ছে চালের কোমলতা। মিষ্টি সুঘ্রাণে ম ম করছে ভোগঘর। শুদ্ধ হয়ে উঠছে শরীর-মন। কোথাও মাপজোকের কড়াকড়ি নেই। নেই এক চামচ চিনি কমানোর হিসেবও — এ দৃশ্য এক রান্নাঘরের।

    মায়াপুর ইসকনের ভোগ রান্না হয় ‘কিচেন’-এ। প্রায় দশটি কিচেনে আলাদা আলাদা ভাবে। প্রতিদিন কত দুধ লাগে, তা বলা মুশকিল। কিন্তু পায়েস থাকবেই। তার পরিমাণও বাঁধা। তাতে নড়চড় হবে না কোনও। ইসকনের জনসংযোগ আধিকারিক রসিক গৌরাঙ্গ দাসের কথায়, ‘প্রতিটি কিচেনেই আলাদা ভাবে ভোগ তৈরি হয়। চিনির দাম বাড়লেও সেই পরিমাণ কমেনি।’

    নবদ্বীপ মহাপ্রভুর জন্মস্থান। সেখানে গড়ে উঠেছে মঠ। রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহে নিত্যপুজো হয়। ভোগে দেওয়া হয় পাঁচ কেজি দুধের পায়েস। মঠাধ্যক্ষ অদ্বৈত দাস বাবাজির কথায়, ‘নিত্য ভোগে হঠাৎ বদল আনা যায় না। আগে যেমন পাঁচ কেজি দুধের পায়েস হতো, এখনও তাই হচ্ছে।’

    তবে সব মন্দিরের গল্প এক নয়। নবদ্বীপে খোদ মহাপ্রভুর বাড়িতে চিনি নিয়ে টানাটানি চলছে। সেবায়েত জয়ন্ত গোস্বামী জানালেন, আগে প্রতিদিন পাঁচ কেজি দুধের পায়েস হতো। এখন তিন থেকে সাড়ে তিন কেজির হচ্ছে। বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভোগের হাঁড়িতেও পড়েছে সংযমের ছায়া।

    মহাপ্রভু বাড়িতে ভোগ রান্না করেন প্রণব গোস্বামী। তিনি জানালেন গোপন কথাটি। পাঁচ কেজি দুধে ৮০০ গ্রাম চিনি লাগে। সঙ্গে ১৫০ গ্রাম কাজুবাদাম, ১৫০ গ্রাম কিশমিশ আর প্রয়োজনমতো তেজপাতা—এই সামান্য উপকরণেই লুকিয়ে অপূর্ব স্বাদ।

    প্রথমে দুধ ফোটানো হয়। ধীর আঁচে। ফুটতে ফুটতে দুধের শরীর ক্রমশ ঘন হয়ে আসে। উপর থেকে ওঠা সর আলতো হাতে মিশে যায় দুধের স্রোতে। সেই সময়ে আঁচ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ঘিয়ে মাখানো গোবিন্দভোগ চাল ঢেলে দেওয়া হয় ফুটন্ত দুধে।

    চাল আর দুধ মিলেমিশে অন্য রূপ নিতে শুরু করে। এই সময়ে একটানা নাড়তে হয়, যাতে চালের দানা অভিমান করে না বসে। দুধের উষ্ণতায় চাল নরম হয়, ফুলে ওঠে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে ঘন হয়ে আসে পায়েসের শরীর।

    চাল সেদ্ধ হয়ে গেলে তাতে পড়ে কাজুবাদাম আর কিশমিশ। সাদা দুধের বুকের মধ্যে বাদামের মৃদু মচমচে ভাব আর কিশমিশের মিষ্টি মিশে যায়। তেজপাতার গন্ধ নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

    এর পর আসে মিষ্টির পালা। দুধ যখন আরও ঘন, চাল যখন সম্পূর্ণ সেদ্ধ, তখন আঁচ একেবারে কমিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ধীরে ধীরে মেশানো হয় চিনি। নাড়তে নাড়তে মিশে যায় মিষ্টি—দুধ, চাল, শুকনো ফল আর চিনির মধ্যে ঘাঁটি গাড়ে স্বাদের সংসার।

    সব শেষে আসে সেই শেষ ছোঁয়া। এলাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয় পায়েসের উপর। এক মুহূর্তেই বদলে যায় তার গন্ধ—মিষ্টির মধ্যে মিশে যায় এলাচের মাদক সুবাস। আলতো হাতে আরও এক বার নেড়ে নামিয়ে নেওয়া হয় ভোগের পায়েস।

    বলদেব ছিলেন অকুতোভয়। লড়াকু। নবদ্বীপে বলদেবের বাড়িতেও যেন চিনির সঙ্গে ‘লড়কে লেঙ্গে’ মনোভাব। প্রতিদিন সাত কেজি দুধের পায়েস হতো। এখনও হচ্ছে। বলদেব বাড়ির কিশোর কৃষ্ণ গোস্বামীর কথায়, ‘ভগবানকে কম দেওয়া যায় না।’

    জগপুর চৈতন্য মঠে গেলে যে কেউ চমকে উঠবে। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কেজি দুধের পায়েস হয়। হাজার হাজার ভক্ত প্রসাদ পান। মঠের পুরী মহারাজ জানান, চিনির দাম বাড়লেও পায়েসের সঙ্গে কোনও আপস নয়। উৎসবের দিনে ভক্ত সমাগম বাড়ে। পায়েসও হয় অনেক।

    নবদ্বীপ-মায়াপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় আড়াইশো মঠ-মন্দির। প্রত্যেকের নিজস্ব রীতি, ভোগের নিয়ম। কিন্তু বাজারের দামের অঙ্ক দিয়ে তার হিসেব মেলাতে বসলে মুশকিল। নবদ্বীপ-মায়াপুরের বহু মন্দিরে পায়েসের হাঁড়ি আগের মতোই ফুটছে। ভোগের পায়েসের স্বাদ বিশ্বাসের। মিষ্টিতে কী যায় আসে!

  • Link to this news (এই সময়)