• ‘বিরুদ্ধমত হলেই শাস্তি বা হুমকি দেওয়া যায় না’, আইন কলেজের সমাবর্তনে সরব জাস্টিস ভুঁইয়া
    এই সময় | ৩১ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়: কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করলেই পড়ুয়াদের হুমকি দেওয়া বা তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না, গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বে প্রশ্ন করার অধিকারের পক্ষে এ ভাবেই সওয়াল করতে শোনা গেল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়াকে।

    দিল্লির 'ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি'র এলএলএম কনভোকেশনের অনুষ্ঠানে বিচারপতি ভুঁইয়াকে বলতে শোনা যায়, 'গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার অধিকার কাউকে অবজ্ঞা করা নয়, বরং নাগরিকত্ব, স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। তাই পড়ুয়ারা যদি কোনও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন, প্রশ্ন করেন, তাঁদের হুমকি দেওয়া যায় না। শাস্তির ভয় দেখানো যায় না। সেটা অসাংবিধানিক। ক্ষমতা এবং পদের অপব্যবহার।'

    একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে যখন আপত্তি উঠছে, সেই প্রেক্ষাপটে জাস্টিস ভুঁইয়ার এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। একটি মামলার প্রেক্ষিতে সমাজের বেকার যুবকদের একাংশকে 'আরশোলা'র সঙ্গে তুলনা করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন সিজেআই কান্ত। সেই মন্তব্যের প্রতিবাদ থেকেই 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)–এর জন্ম।

    পরবর্তী সময়ে ছাত্রবিক্ষোভে পুলিশি অত্যাচারের ভিডিয়ো 'দেখার সময় নেই' বলে ফের প্রশ্নের মুখে পড়েন সিজেআই। এই প্রেক্ষাপটেই প্রথমে হায়দরাবাদের আইন বিশ্ববিদ্যালয় নালসারের পড়ুয়ারা তাঁদের সমাবর্তনে চিফ গেস্ট হিসেবে সিজেআই কান্তকে আমন্ত্রণের প্রতিবাদ করেন। এর পাল্টা 'বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া' (বিসিআই) ঘোষণা করে, নালসারের ২০২৬–এর ব্যাচের গ্র্যাজুয়েটদের কোনও রাজ্যের বার কাউন্সিলে প্র্যাক্টিসের সুযোগ দেওয়া হবে না! তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চই বার কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে কড়া ভর্ৎসনা করে। চাপের মুখে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত বদলায় বিসিআই। এর মধ্যেই বেঙ্গালুরুর 'ন্যাশনাল ল স্কুল অফ ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি'র পড়ুয়ারা সমাবর্তনে সিজেআই এবং বিসিআই চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণের বিরোধিতা করেন।

    পর পর এমন ঘটনার প্রেক্ষিতে বিচারপতি ভুঁইয়ার বক্তব্য, 'আমাদের সংবিধান একই রকম ভাবনার কথা বলে না। বরং বিভিন্ন বিশ্বাস, ভাবধারা এবং মতাদর্শের মানুষ যাতে সমান মর্যাদা নিয়ে সমাজে বাস করতে পারেন, আমাদের সংবিধান সেই পরিকাঠামোর কথা বলে। সকলে একই মতবাদে বিশ্বাসী হলে সেটা একটা আদর্শ গণতান্ত্রিক সমাজ হতে পারে না। আমাদের সংবিধান সহনশীলতার গভীর অর্থ শেখায়, ব্যক্তিসত্ত্বাকে বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে না। বরং সংবিধান বোঝায়, স্বাধীন একটা সমাজে ভিন্ন মতামত, বিশ্বাস থাকবেই। ভিন্নমতের জায়গা থাকবে।'

    জাস্টিস ভুঁইয়ার মতে, ভারত বুদ্ধ–গান্ধীর শান্তির দেশ, সেখানে হিংসার স্থান নেই। তাঁর সংযোজন, 'আমরা যদি মতবিরোধকে সম্মান করা গণতান্ত্রিক সমাজ চাই, তা হলে সেই সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু করতে হবে। সেখান থেকেই মুক্ত চিন্তাধারার সূত্রপাত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এমন হবে, যাতে পড়ুয়ারা অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতেও দ্বিধাগ্রস্ত না হন। যাতে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে ক্ষমতার ব্যবহার করা হয়।' এই প্রসঙ্গে আইনকর্মী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বড় ভূমিকা রয়েছে বলেও মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠান–বিরোধী কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করার অভিযোগ উঠছে, সেই প্রেক্ষিতে বিচারপতি ভুঁইয়ার মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও।

  • Link to this news (এই সময়)