একুশের বিধানসভায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করে প্রথম জয়ের মুখ দেখিয়েছিল নন্দীগ্রাম। ছাব্বিশে রাজ্যজয়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নন্দীগ্রাম ফের বুকে টেনে নিয়েছিল ‘ঘরের ছেলে’কেই। সোমবার নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় প্রশাসনিক সভা থেকে সেখানকার ভোটারদের জন্য কল্পতরু রূপে ধরা দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা নন্দীগ্রামের ‘ঘরের ছেলে’ শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, আবাস থেকে অন্নপূর্ণা। সবক্ষেত্রেই ঢালাও পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরলেন তিনি। বললেন, ‘ভোট দেননি তো কী, আমি সবার মুখ্যমন্ত্রী।’
এবার ছাব্বিশের নির্বাচনের ভবানীপুরের পাশাপাশি নন্দীগ্রামেও (Nandigram) লড়াই করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। নিয়ম অনুযায়ী, একটি কেন্দ্র ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার নন্দীগ্রামের মাটিতে পা রেখেই তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রটি আমাকে ছাড়তে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমি নন্দীগ্রামকে বুক দিয়ে আগলে রাখব। এবং তা যে শুধু কথার কথা নয়, এদিন বৈঠকের পরতে পরতে তা বুঝিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, “এই সাড়ে তিন মাস বা চার মাসে ৩২টি নতুন রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার। বেশ কিছু রাস্তার উদ্বোধন বা নতুন রাস্তার ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন হয়েছে। ১৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে তৈরি হওয়া গ্রামীণ এলাকা নন্দীগ্রামে পরিকাঠামোগত উন্নয়নে একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল।”
তৃণমূল জমানার শেষ পাঁচ বছরে কী পেয়েছে নন্দীগ্রাম, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, “২০২১ সালে আমার কাছে হারের পর হিংসায় নন্দীগ্রামের যাবতীয় উন্নয়ন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, মাত্র ছয় একর জমির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তৃণমূল সরকার সেটুকুও রেলকে দেয়নি। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সাড়ে তিন একর জমি রেলকে হস্তান্তর করেছেন। বাকিটাও আগামী মার্চের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “নন্দীগ্রাম-বটতলা রেলস্টেশনে উঠব। বাজকুলে গিয়ে নামব। প্রথম ট্রেনে আমিই চড়ব আপনাদের নিয়ে। কারও কোনও অভাব থাকবে না।”
এদিন গুরুত্বপূর্ণভাবে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা হলদিয়া-নন্দীগ্রাম ব্রিজের কাজের অগ্রগতির কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “হলদিয়ার সঙ্গে নন্দীগ্রামকে জোড়ার ব্রিজের কাজ এগিয়ে দিয়েছি। ভূমিপূজনেও আসব। ব্রিজের উপর দিয়ে প্রথম গাড়িটা নিয়ে যাব আমি।” এর পাশাপাশি তিনি বলেন, “আজ এখান থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিকশিত ভারত জিরাম-জি জব কার্ড হোল্ডার ১২৫দিনের কাজের সূচনা হল। এই বছরে নন্দীগ্রামে ১১ হাজার ৭০০ নতুন বাড়ি তৈরি করব। প্রথম কিস্তি ৬০ হাজার টাকাও দেওয়ার ব্যবস্থা। এছাড়াও আমরা নন্দীগ্রামের হরিপুর একটি দমকল কেন্দ্রের উদ্বোধন করলাম।” তিনি আরও বলেন, “৬০ বেড বিশিষ্ট রেয়াপাড়া হেলথ সেন্টার। নন্দীগ্রাম জেলা হাসপাতালে নিউ মা মাতৃ বিল্ডিংয়ের কাজ শুরু হল রোগীদের আত্মীয়দের জন্য। নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে জনৌষধি কেন্দ্র চালু হবে। মা-আহার ক্যান্টিন চালু করা হল।” নন্দীগ্রামে পুলিশ মর্গ তৈরির ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী।
সেইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, “এখনও অবধি নন্দীগ্রামে আগস্টে ৬৭ হাজার মহিলার অ্যাকাউন্টে ৩ হাজার করে টাকা ঢোকানো হয়েছে। আরও ৫ হাজার ভেরিফিকেশনে আন্ডার প্রসেসে আছে, যোগ্য প্রমাণিত হলে টাকা পেয়ে যাবেন। ১৭ অঞ্চলে ৬৭ হাজার মহিলাকে টাকা দেওয়া ছোটখাটো কাজ নয়।” পাশাপাশি বিনামূল্যে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার অধিকারের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২.৫ লক্ষ মানুষকে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ পেয়েছেন। নিয়মের জটিলতায় আটকে যাওয়া আরও ৮৭ হাজার মানুষকে ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবীমা’ কার্ড দেওয়া হচ্ছে। দুই প্রকল্পের আওতায় ১৯০০ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়াও দেশের প্রথম সারির হাসপাতালে চিকিৎসা-সুবিধা পাবেন।